‘বিজেপির গুণ্ডাদের রুখতে পাহারা দেব!’ ২১ জুলাইয়ের ঠিক আগে কলকাতার বুকে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা!

২১ জুলাই ঐতিহাসিক শহিদ দিবস পালনের প্রাক্কালে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনায় ফুটল তিলোত্তমা কলকাতা। সোমবার রাতে, অর্থাৎ ২১ জুলাইয়ের আগের রাতেই কলকাতার বুকে এক নাটকীয় ও তীব্র সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, ‘কালীঘাট-তৃণমূল’-এর নির্ধারিত সভাস্থলে গভীর রাতে অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে। সভাস্থলের কাছে থাকা তৃণমূলের একাধিক ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, রাতের অন্ধকারে সভাস্থলের মাইকের তারও খুলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করে শাসকশিবির। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং সভাস্থলের সুরক্ষায় রাতভর কলকাতার কেন্দ্রস্থল বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে ধর্নায় বসে পড়েন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই নজিরবিহীন অবস্থানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একে একে যোগ দেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ। এছাড়াও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন দলের একাধিক হেভিওয়েট সংসদ সদস্য ও নেতা-নেত্রীরা, যার মধ্যে দোলা সেন এবং ডেরেক ও ব্রায়েনের মতো শীর্ষ নেতৃত্বও সারারাত রাস্তায় অবস্থান করেন। মধ্যরাতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি বিজেপিকে আক্রমণ করে বলেন, “বিজেপির গুণ্ডারা মরিয়া হয়ে সভাস্থলে হামলা চালাচ্ছে। দলের কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এবং মঞ্চ পাহারা দিতে আমি নিজেই সারারাত রাস্তায় বসে পাহারা দেব।” তৃণমূল সূত্রে খবর, প্রতিপক্ষের এই পরিকল্পিত আক্রমণকে ভেস্তে দিতে এবং একুশের সভাকে সফল করতেই শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি রাতের রাস্তায় নেমে নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে তৃণমূলের এই অবস্থান ও প্রতিবাদের তীব্র সমালোচনা করে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ লোকদেখানো এবং রাজনৈতিক ফায়দা তোলার সস্তা নাটক। বিজেপির কটাক্ষ, “ওখানে ২৫ জন মানুষেরও জমায়েত হবে না জেনেই তৃণমূল এখন নাটক শুরু করেছে। নিজেদের অন্তর্কোন্দল এবং চরম জনসমর্থনহীনতা ঢাকতেই এই ধরনের কল্পিত হামলার অভিযোগ তুলছে শাসকদল।” বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক ও রাজ্য নেতা কুণাল ঘোষ অবশ্য বিরোধীদের এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা সাফাই গেয়েছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জোরালো কণ্ঠে জানান, “দলের মঞ্চ পাহারা দিতে এবং বিরোধীদের যেকোনো ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা রুখতে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় নেমেছেন। দলীয় কর্মীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই এই রাতভর প্রতিবাদ।”
অন্যদিকে, এই রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদের মাঝেই এ বছরের ২১ জুলাইয়ের ভিন্ন এক ছবি ধরা পড়েছে গোটা কলকাতা শহরে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ বারের একুশে জুলাই যেন দলীয় কোন্দল এবং বিভাজনের শিকার। খণ্ডবিখণ্ড তৃণমূল কংগ্রেসের কারণে এ বছর শহরের বিভিন্ন প্রান্তে আলাদা আলাদাভাবে ২১ জুলাই পালিত হচ্ছে। ক্যাথিড্রাল রোডে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর মূল সমাবেশ, মেয়ো রোডের অন্য একটি মঞ্চে ২১ জুলাই পালন করছে ‘ঋতব্রত তৃণমূল’ শিবির, আবার শহিদ মিনার চত্বরে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে একুশে জুলাই পালন করছে কংগ্রেসও। চারদিকে বিভিন্ন শিবিরের ২১ জুলাই পালনের ঘোষণা থাকলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই চিরাচরিত উন্মাদনা এবং ভিড় চোখে পড়েনি।
কলকাতার রাস্তায় বেরিয়ে দেখা গেছে, অতлет বছরের চেনা ভিড় এবং যানজটের ছবি এ বার পুরোপুরি উধাও। রবিবারের ছুটির আমেজ পেরিয়ে সোমবারও কলকাতার প্রধান রাস্তাগুলিতে ২১ জুলাইয়ের সেই চিরপরিচিত উপচে পড়া ভিড় কার্যত লক্ষ্য করা যায়নি। লোকাল ট্রেন, বাস, ট্রাম কিংবা মেট্রো—কোনো জায়গাতেই অতিরিক্ত যাত্রীদের কোনো চাপ ছিল না। একুশের নির্দিষ্ট কয়েকটি সভাস্থল বাদে কলকাতার বুকে তৃণমূলের পতাকা বা ফেস্টুনের আধিক্যও চোখে পড়ার মতো ছিল না। এমনকি হাওড়া ও শিয়ালদা স্টেশনের মতো ব্যস্ততম রেলওয়ে স্টেশনগুলিতেও অন্যান্য সাধারণ দিনের মতোই স্বাভাবিক যাতায়াত দেখা গেছে। হাওড়ার ফেরিঘাটগুলিতেও একুশে জুলাইকে কেন্দ্র করে কোনো বাড়তি যাত্রীর চাপ বা উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়নি। কলকাতা থেকে শুরু করে দূরদূরান্তের জেলাগুলিতেও এ বারের ২১ জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক উন্মাদনা যথেষ্ট ক্ষীণ বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।