ডিম-ভাতের বিশাল হাঁড়ি নেই! দল ভাঙার ধাক্কায় ২১ জুলাইয়ের মেজাজ কি তবে এক্কেবারে ফিকে?

২১ জুলাই মানেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক শহিদ দিবস। অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের এই মেগা সমাবেশ মানেই কর্মী-সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড় এবং তাদের পাতে সুস্বাদু ডিম-ভাতের এলাহি আয়োজন। বিরোধীরা এই ভোজনপর্বকে বরাবর ‘ডিম ভাত উৎসব’ বলে কটাক্ষ করলেও, বছরের পর বছর ধরে এই সংস্কৃতি ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে একুশের উন্মাদনা। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদল এবং দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের জেরে এ বছরের একুশে জুলাইয়ের ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভিক্টোরিয়া হাউসের চত্বর বদলে হাইকোর্টের নির্দেশে এ বার মমতাপন্থীদের সভা স্থানান্তরিত হয়েছে বিড়লা তারামণ্ডল চত্বরে। আর সেই বিশাল আয়োজনের পরিবর্তে এ বার কলকাতার রাজপথে দেখা মিলল সম্পূর্ণ এক অন্য চিত্রের।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিড়লা তারামণ্ডলের অদূরে চৌরঙ্গী রোডের ওপর বিশপ হাউসের সামনের ফুটপাতে চলছে অতি সাধারণ এই ডিম-ভাত রান্নার আয়োজন। তবে আগের মতো সেই সুবিশাল হাঁড়ি-কড়া কিংবা হাজার হাজার মানুষের ঢল আজ আর চোখে পড়ে না। নদীয়ার তেহট্ট থেকে আসা জনায়েক মমতাপন্থী সমর্থক রিন্টু মণ্ডল জানান, অতীতে তাঁরা প্রায় দেড়শো জন একসঙ্গে আসতেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাধা ও নানা অনিশ্চয়তার কারণে এ বার মাত্র ৩৫ জন সমর্থক উপস্থিত হতে পেরেছেন। তা সত্ত্বেও দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা এবং একুশের ঐতিহ্য বজায় রাখতে তাঁরা নিজেদের মতো করেই এই রান্নার বন্দোবস্ত করেছেন।

প্রতিবছর ২১ জুলাইয়ের প্রাক্কালে গোটা রাজ্যজুড়ে যে সাজো সাজো রব ও উন্মাদনা তৈরি হতো, তা এ বার যেন অনেকটাই ম্লান। অতীতে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র কিংবা সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্কে দূরদূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের থাকা ও খাওয়ার বিরাট বন্দোবস্ত করা হতো। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ায় সেই চেনা জনস্রোত আজ উধাও। কর্মীরা মমতাপন্থী নাকি অন্য কোনো শিবিরে যোগ দেবেন, তা নিয়ে তৃণমূল সমর্থকদের একটা বড় অংশের মধ্যে স্পষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। ফলস্বরূপ, অতীতে যে বিশালাকার কড়ায় কুড়ি-পঁচিশ হাজার মানুষের খাবার রান্না হতো, তা আজ রূপ নিয়েছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজনের ফুটপাতের রান্নায়।

এদিকে, রাজনীতির ময়দানে ডিমের সমীকরণ কেবল খাবারের পাতেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন সময়ে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর ডিম্বর্ষণের মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও জনরোষের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক সমীকরণ যতই পাল্টাক এবং কর্মী-সমর্থকদের সংখ্যা ও জমায়েত যতই ফিকে হয়ে আসুক না কেন, একুশে জুলাইয়ের সঙ্গে ডিম-ভাতের এই দীর্ঘদিনের নস্ট্যালজিয়া যে আজও সমর্থকদের মনে সমানভাবে অটুট রয়েছে, তা এই ছোট্ট পরিসরের আয়োজন থেকেই পরিষ্কার হয়ে গেল।