বঙ্গ রাজনীতি এখন কার্যত এক ‘বাইনারি’ সমীকরণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আপনি, অন্যদিকে আমি—বাকিরা যেন পেন্সিল দিয়ে লেখা অস্পষ্ট রেখা। মালদহে বিচার বিভাগীয় অফিসারদের ঘেরাও কাণ্ডে সুপ্রিম কোর্ট বাংলাকে ‘Most Polarised State’ বা সবথেকে বেশি মেরুকরণ হওয়া রাজ্য হিসেবে দেগে দিয়েছে। তবে রাজনীতির ময়দানে সমালোচনা নয়, বরং এই মেরুকরণই এখন ভোটের সবথেকে বড় ‘চলরাশি’ বা ভেরিয়েবল।
শব্দ যখন রাজনৈতিক অস্ত্র: কিওয়ার্ডের লড়াই
২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি শব্দকে বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন— ‘বহিরাগত’। ভিনরাজ্যের বিজেপি নেতাদের এই তকমা দিয়ে তিনি সফলভাবে ‘বাঙালি অস্মিতা’য় শান দিয়েছিলেন। ফলও মিলেছিল হাতেনাতে। কিন্তু ২০২৬-এর চিত্রনাট্যে প্রবেশ করেছে নতুন এক কিওয়ার্ড— ‘ঘুসপেটিয়া’।
‘ঘুসপেটিয়া’ শব্দের ব্যবচ্ছেদ
বাংলা ভাষায় সাচ্চা, টহল, কেল্লা বা ডেরার মতো অসংখ্য উর্দু-ফারসি শব্দ মিশে রয়েছে। কিন্তু ‘অনুপ্রবেশকারী’র বদলে ‘ঘুসপেটিয়া’ শব্দটি এখন বাঙালির মুখে মুখে। ভাষাবিদ পবিত্র সরকারের মতে, হিন্দি ও উর্দু মেশানো এই শব্দের অর্থ— যারা অনধিকার প্রবেশ করে। ২০১৪ সাল থেকে মোদী-শাহ জুটি এই শব্দটি ব্যবহার করলেও ২০২৬-এর আগে এটিই এখন বিজেপির প্রধান প্রচার অস্ত্র।
তর্ক বনাম বিতর্ক: কে দায়ী?
বিজেপির মূল অভিযোগ, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের (ঘুসপেটিয়া) আশ্রয় দিয়ে তৃণমূল তাদের ভোটব্যাঙ্ক বাড়িয়েছে। পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তাঁর প্রশ্ন:
“সীমান্ত তো পাহারা দেয় বিএসএফ (BSF)। তারা যদি অনুপ্রবেশ আটকাতে না পারে, তবে তার দায় তো কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের।”
বহিরাগত বনাম ঘুসপেটিয়া: লড়াইটা ন্যারেটিভের
দুই মেরুর দুই শব্দবন্ধের লক্ষ্য কিন্তু আলাদা:
বহিরাগত: এটি ছিল আঞ্চলিক পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আবেগ রক্ষার লড়াই।
ঘুসপেটিয়া: এটি মূলত জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং নাগরিকত্বের (CAA-NRC) প্রশ্নকে উসকে দেওয়ার কৌশল।
শব্দ বদলালে কি সমীকরণ বদলায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের শব্দবন্ধ আসলে ভোটারদের মনে ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’ বিভাজনকে স্পষ্ট করে। মেরুকরণ যত তীব্র হয়, রাজনৈতিক দলের ফায়দা তত বেশি। ২০২৬-এর ভোট শুধু আসন দখলের নয়, বরং কার ‘ন্যারেটিভ’ সাধারণ মানুষের মনের গভীরে পৌঁছাতে পারে, তারই অগ্নিপরীক্ষা। ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে কি আবারও কিস্তিমাত করবেন মমতা? নাকি ‘ঘুসপেটিয়া’ তাস খেলে নবান্নের দখল নেবে বিজেপি? উত্তর দেবে সময়।





