বর্ধমানে আইএসআই ও জইশ যোগ! মুখ্যমন্ত্রীর গতিবিধিতে নজরদারির অভিযোগে গ্রেপ্তার ধৃত জঙ্গি

পশ্চিম বর্ধমানের কালনার পর এবার পূর্ব বর্ধমান। শহরের প্রাণকেন্দ্র রেনেসাঁ হাউসিং কমপ্লেক্স থেকে গ্রেপ্তার হওয়া সন্দেহভাজন জঙ্গি হামিদ মণ্ডলকে ঘিরে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)-এর বিস্ফোরক দাবি, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ-এর সাজ্জাদ ভাট গোষ্ঠীর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ ছিল এই ব্যক্তির। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর সঙ্গেও তার প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের।

এসটিএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, হামিদ মণ্ডল বর্ধমানের রেনেসাঁ হাউসিংয়ে নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে আত্মগোপন করে ছিল। এর আগে কলকাতার নিউ টাউনের একটি ঠিকানাতেও সে বেশ কিছুদিন গা ঢাকা দিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গোয়েন্দাদের জোরালো সন্দেহ, এই সময়কালে সে রাজ্যের বিভিন্ন সংবেদনশীল ও গোপন তথ্য সংগ্রহের অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ চালাচ্ছিল।

সবচেয়ে গুরুতর এবং উদ্বেগজনক অভিযোগটি হলো, মুখ্যমন্ত্রীর গতিবিধি বা অবস্থান সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাঁর উপর কড়া নজরদারির কাজে সরাসরি যুক্ত ছিল হামিদ। তদন্তকারীদের জোরালো আশঙ্কা, এই ধরনের তথ্য সংগ্রহের নেপথ্যে কোনও ভয়াবহ নাশকতার ব্লু-প্রিন্ট বা বড় কোনো হামলার পরিকল্পনা ছিল কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসটিএফ-এর দাবি, হামিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের গোপন গ্রুপের মাধ্যমে সাজ্জাদ ভাট গোষ্ঠীর শীর্ষ স্থানীয় সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। মূলত সেই সমস্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকেই বিভিন্ন গোপন নির্দেশ তার কাছে এসে পৌঁছত।

এবিপি আনন্দ-র প্রবীণ সাংবাদিক সুমন দে জানিয়েছেন, হামিদ মণ্ডল নির্দিষ্টভাবে মুখ্যমন্ত্রীর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ঘৃণ্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। এর নেপথ্যে কি তবে ভিভিআইপি ব্যক্তিত্বদের উপর হামলার বড় কোনো পরিকল্পনা ছিল? এই প্রশ্নটিই এখন রাজ্যজুড়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট গোপন সূত্রের খবরের ভিত্তিতেই বর্ধমান শহরের অভিজাত রেনেসাঁ হাউসিংয়ে আকস্মিক অভিযান চালায় এসটিএফ। সেখান থেকেই তাকে হাতেনাতে পাকড়াও করা হয়। বর্তমানে ধৃতের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস এবং বাজোপ্ত করা নথিপত্র অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। এই জঙ্গি নেটওয়ার্কের পরিধি ঠিক কতটা বিস্তৃত, তা জানার চেষ্টা চলছে।

এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রায় দেড় মাস আগে এক মহিলা ও তিনটি শিশুকে নিয়ে সে ওই ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতে শুরু করে। প্রতিবেশীদের কাছে ওই মহিলা ও শিশুদের নিজের স্ত্রী ও সন্তান বলেই পরিচয় দিয়েছিল হামিদ। আশপাশের লোকজনকে কখনও নিজেকে আইটি কর্মী, আবার কখনও কলেজ শিক্ষক বলে বিভ্রান্ত করত সে। কিন্তু তার এই মুখোশের আড়ালে যে এমন ভয়ংকর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লুকিয়ে ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কেউ।

পুলিশের আরও চাঞ্চল্যকর দাবি, সাজ্জাদ ভাট গোষ্ঠী এবং আইএসআই-এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশে হামিদ বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় রেকি চালাত। শুধু কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাই নয়, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের গতিবিধির ওপরও তীক্ষ্ণ নজরদারি চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে, জঙ্গি সংগঠনের জন্য নতুন ও তরুণ সদস্য নিয়োগের কাজও দক্ষতার সঙ্গে চালাচ্ছিল সে। প্রাথমিক তদন্তের পর এসটিএফের দাবি, গত আড়াই থেকে তিন মাস ধরে সে এই নাশকতামূলক কাজ চালিয়ে আসছে। ধৃতের ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য ঘেঁটে দেখা হচ্ছে তার সঙ্গে আর কারা সরাসরি যোগাযোগ রাখত, রাজ্যে কোনো গোপন স্লিপার সেল সক্রিয় ছিল কি না এবং সংগৃহীত তথ্য ঠিক কোথায় পাচার করা হতো। শুক্রবারই অভিযুক্তকে আদালতে তোলা হবে এবং নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জোরালো আবেদন জানাবে এসটিএফ।