উমর খালিদের জামিনের আর্জি, দিল্লি হাইকোর্টের নোটিসে নতুন মোড়!

২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গার পেছনের তথাকথিত ‘বৃহৎ ষড়যন্ত্র’ (Larger Conspiracy) মামলা এবং কঠোর ইউএপিএ (UAPA) আইনের জেরে কারাবন্দী জেএনইউ-এর প্রাক্তন ছাত্র উমর খালিদের জামিনের নতুন আর্জিতে অবশেষে দিল্লি পুলিশের জবাব তলব করেছে দিল্লি হাইকোর্ট (Delhi High Court)। শুক্রবার বিচারপতি প্রতিভা এম. সিং এবং বিচারপতি বিকাশ মহাজনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশিকা জারি করে দিল্লি পুলিশকে নোটিস পাঠিয়েছে এবং আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ২৭ অগস্ট এই অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ওই একই দিনে এই মামলার অপর অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত তথা ছাত্রনেতা শারজিল ইমামের জামিনের মামলাটিও শুনানির তালিকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে হাইকোর্টের একই ডিভিশন বেঞ্চে দুটি অত্যন্ত আলোচিত মামলা একসঙ্গে শুনানির জন্য উঠবে, যা দেশের আইনি ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে।
আদালতে শুনানিকালে উমর খালিদের আইনজীবী সবিস্তারে জানান যে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পথে এটি তাঁর মক্কেলের তৃতীয় জামিনের আবেদন। বর্তমান আবেদনে নিয়মিত জামিনের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে অন্তরিণ বা অন্তর্বর্তীকালীন জামিনেরও জোরালো আর্জি জানানো হয়েছে। মূলত গত ৪ জুলাই নিম্ন আদালত (ট্রায়াল কোর্ট) তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। সেই নির্দেশকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন উমর খালিদ। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের পক্ষে উপস্থিত বিজ্ঞ অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) এস ভি রাজু আদালতকে জানান যে, একই ট্রায়াল কোর্টের একটি অভিন্ন আদেশে শারজিল ইমামের জামিনের আবেদনও খারিজ করা হয়েছিল। সেই কারণে বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সুবিধার স্বার্থে উভয় মামলাই হাইকোর্টের একই বেঞ্চে সমান্তরালভাবে বা একসঙ্গে শুনানি করা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।
উল্লেখ্য, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (CAA) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC)-র বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসা ও তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছিল। সুদীর্ঘ সেই দাঙ্গার আগুনে পুড়ে ৫৩ জনের সকরুণ মৃত্যু হয়েছিল এবং ৭০০-রও বেশি সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এই ঘটনার পেছনে সুদূরপ্রসারী ‘বৃহৎ ষড়যন্ত্র’ রয়েছে দাবি করে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল একটি বিশেষ মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে। এই মামলাতেই উমর খালিদ ছাড়াও শারজিল ইমাম, খালিদ সাইফি, এবং তৎকালীন আম আদমি পার্টির (AAP) কাউন্সিলর তাহির হুসেন-সহ একাধিক হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের মূল অভিযোগ, উমর খালিদ এই গোটা সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান মাস্টারমাইন্ড ও ষড়যন্ত্রকারী।
এর আগের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ৪ জুলাই নিম্ন আদালত উমর খালিদের জামিনের আবেদন খারিজ করার সময় সাফ জানিয়েছিল যে, সুপ্রিম কোর্টের গত ৫ জানুয়ারির নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলার বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের কাছে এই মুহূর্তে এই আবেদন এন্টারটেইন করার বা স্বস্তি দেওয়ার আইনি সুযোগ বা এক্তিয়ার নেই। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লি হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ উমর খালিদের জামিনের আবেদন সুনির্দিষ্টভাবে নাকচ করেছিল। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় বহাল রাখলেও, সহ-অভিযুক্ত গুলফিশা ফাতিমা, মিরান হায়দার, শিফা উর রহমান, মহম্মদ সালিম খান এবং শাদাব আহমেদের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছিল। সেই সময় শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছিল যে, UAPA-র অধীনে উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের বিরুদ্ধে আনীত প্রাথমিক বা প্রাইমা ফেসি মামলা যথেষ্ট জোরালো এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের তারতম্যের (Hierarchy of participation) কারণে সব অভিযুক্তকে সমান সমান্তরালে দেখা যায় না। এখন দিল্লি পুলিশকে নোটিস পাঠানোর পর আগামী ২৭ অগস্ট হাইকোর্ট এই হাই-প্রোফাইল মামলার পরবর্তী শুনানিতে কী অন্তর্বর্তী বা চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়, সেদিকেই এখন দেশের সমস্ত আইনি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক মহলের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে।