কুণাল ঘোষের হাতে কোন অদ্ভুত সরীসৃপ? গিরগিটির মতো রং বদলালেও এর বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা, জানুন

গিরগিটির চরিত্র ও স্বভাব নিয়ে কথা উঠলেই অবধারিতভাবে যেমন রাজনীতির প্রসঙ্গ চলে আসে, তেমনই এই প্রাণীর মাহাত্ম্যই আলাদা। আর সেই গিরগিটি যদি হয় ‘কালীঘাটপন্থী’ নেতা কুণাল ঘোষের হাতে, তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার তাৎপর্য যে বহুমাত্রিক, তা বলাই বাহুল্য। তবে, বেলেঘাটার বিধায়কের হাতে যে সরীসৃপটি দেখা গিয়েছে, তা কিন্তু সাধারণ কোনো গিরগিটি নয়। এটি এমন এক প্রাণী, যা যখন-তখন হুট করে রং পরিবর্তন করে না; বরং পরিস্থিতি বুঝে, সুযোগ বুঝে ধীরে ধীরে রং বদলায়। আকারে যতই বিশাল হোক না কেন, স্বভাবের দিক থেকে এরা বেশ ভীতু প্রকৃতির! এদের একটি বিশেষ ‘তৃতীয় চোখ’ থাকে, যা দিয়ে এরা বহু দূরে থাকা আগাম বিপদ আঁচ করতে পারে। আবার সুযোগ পেলে বন্ধুত্ব পাতিয়ে মানুষের বেডরুমে থাকতেও এদের কোনো অসুবিধা হয় না। বিশ্বের শৌখিন মহলে সমাদৃত এই exotic সরীসৃপের নাম ‘ইগুয়ানা’ (Iguana)।

কোথায় দেখা মেলে এদের?
ইগুয়ানা হলো মূলত বিশেষ প্রজাতির এক বিশাল আকারের সরীসৃপ। দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা, মেক্সিকো এবং ক্যারেবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ঘন বৃষ্টিঅরণ্য ও ক্রান্তীয় অঞ্চলেই মূলত এদের আদি বসবাস। তবে বর্তমান সময়ে বিদেশি বা এক্সোটিক পোষ্য (Exotic Pet) হিসেবে বিশ্বজুড়ে ইগুয়ানার বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছে। আজকাল বহু ধনী ও শৌখিন মানুষ গতানুগতিক কুকুর বা বিড়াল বাদ দিয়ে বেছে নিচ্ছেন এই অদ্ভূত সুন্দর ইগুয়ানা সরীসৃপটিকে।

কী খায় ইগুয়ানা?
খাবারের দিক থেকে এরা একেবারে সাত্ত্বিক। এরা মূলত গাছে থাকতেই পছন্দ করে এবং প্রধানত পাতা, ফুল ও বিভিন্ন ধরনের ফলমূল খেয়েই বেঁচে থাকে। চোখে-মুখে প্রবল রাগ বা ভয়াল রূপ দেখানোর চেষ্টা করলেও এরা মোটের ওপর স্বভাবের দিক থেকে বেশ ভীতু হয়। যদি এদের ঠিকঠাকভাবে ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে এরা দারুণভাবে পোষ মানে। এরা লম্বায় প্রায় ৫ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত হতে পারে এবং এদের শারীরিক ওজন ৫ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

কখন এবং কীভাবে রং বদলায়?
সাধারণ গিরগিটি বা ক্যামেলিয়নের মতো এরা কিন্তু সেকেন্ডের মধ্যে বা চটজলদি রং বদলাতে পারে না। গিরগিটি যেমন শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে বা আশেপাশের গাছের পাতার রঙের সঙ্গে মিশে যেতে মুহূর্তে নিজের গায়ের রং বদলে ফেলে, ইগুয়ানার রং বদলানোর প্রক্রিয়াটি তার থেকে অনেকটাই আলাদা এবং বেশ ধীরগতির। বাস্তবে ইগুয়ানার গায়ের রং পরিবর্তনের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে— জীবের নিজস্ব মুড বা মেজাজ, চারপাশের তাপমাত্রা এবং বয়স কিংবা প্রজনন ঋতু।

রহস্যময় ‘তৃতীয় চোখ’:
সাধারণ গিরগিটির মতোই এদের মাথায় একটি বিশেষ ‘প্যারিয়েটাল আই’ (Parietal eye) বা তৃতীয় চোখ থাকে। এই চোখের মূল কাজ কোনো কিছু দেখা নয়, বরং চারপাশের পরিস্থিতি ও আগাম বিপদ অনুমান করা। মাথার ওপরের এই বিশেষ অঙ্গটি আলো ও ছায়ার সামান্য পরিবর্তন নিখুঁতভাবে টের পেতে সাহায্য করে। এমনকি ওপর থেকে বাজপাখি বা অন্য কোনো শিকারি পাখির আক্রমণ নেমে আসার আগেই তা বুঝতে এই চোখ দারুণভাবে সাহায্য করে। তাছাড়া আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও এদের জুড়ি মেলা ভার। কোনো শত্রু পিছু নিলে বা বিপদের গন্ধ পেলে এরা নিজেদের চাবুকের মতো শক্ত ও ধারালো লেজ সজোরে আছড়ে আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে। এমনকি শিকারির হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে টিকটিকির মতো এরা নিজেদের লেজ খসিয়ে পালিয়ে যেতেও সম্পূর্ণ সক্ষম, যা পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময়ে আবার নতুন করে গজিয়ে যায়!

জল এবং গাছে চড়ার ক্ষেত্রে এদের দক্ষতা সত্যিই বিস্ময়কর। এরা অত্যন্ত পটু ও দুর্দান্ত সাঁতারু এবং গাছের ওপরের ডাল থেকে প্রায় ৪০-৫০ ফুট নিচে সরাসরি লাফিয়ে পড়লেও সামান্য আঘাত বা ক্ষতি ছাড়াই দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকে। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশে ইগুয়ানার গড় আয়ু ১২ থেকে ১৫ বছর হলেও, মানুষের নিখুঁত দেখভালে এরা প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘজীবী হতে পারে।

বাড়িতে পুষতে চাইলে কী করবেন?
ভারতে যেকোনো বিদেশি বা এক্সোটিক প্রাণী পোষার ক্ষেত্রে কিছু কড়া সরকারি নিয়মকানুন ও আইনি প্রোটোকল মেনে চলতে হয়। কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের অফিসিয়াল ‘PARIVESH’ পোর্টালে এই ধরনের এক্সোটিক পেটের সঠিক রেজিস্ট্রেশন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য নথিভুক্ত করা সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। সামান্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পছন্দ করা এই অদ্ভুত সুন্দর প্রাণীটি একবার নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিলে দিব্যি আপনার কোল আলো করে বসে থাকবে, ঠিক যেমনটা সম্প্রতি কুণাল ঘোষের ছবিতে দেখতে পাওয়া গিয়েছে!