“বন্দরে আটকে ৫ লক্ষ টন চাল!”-ইরান -আমেরিকা যুদ্ধে বিরাট সংকটের আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের

রেড সি (লোহিত সাগর) এবং হরমুজ় প্রণালীর বর্তমান যুদ্ধাবস্থা ও তীব্র উত্তেজনার জেরে ভারতের চাল রপ্তানিতে নতুন করে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে মারাত্মক অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সৌদি আরব, ইরান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক বাজারে চাল পাঠাতে গিয়ে চরম সমস্যার মুখে পড়েছেন দেশের রপ্তানিকারকরা। এর জেরে একদিকে যেমন পরিবহণ ও বিমার খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, তেমনই পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার সময়ও অতিরিক্ত প্রলম্বিত হচ্ছে। এর ফলে গুজরাটের কান্ডলা ও মুন্দ্রা বন্দর মিলিয় বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষ টন চাল রপ্তানির অপেক্ষায় আটকে রয়েছে।
কোন কোন সমুদ্রপথে এবং কেন তৈরি হচ্ছে সমস্যা?
রেড সি-র বাব-আল-মান্দাব (Bab al-Mandab) প্রণালীতে নিরাপত্তা সংকটের কারণে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ় প্রণালীতেও বাণিজ্যিক জলযান চলাচল নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পঞ্জাবের বাসমতি রাইস মিলার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রণজিৎ সিং জোসান এই প্রসঙ্গে জানান, “পণ্য পরিবহণের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে একসঙ্গে সমস্যা তৈরি হওয়ায় ভারতের রপ্তানিকারকদের সামনে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণের খরচ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং বিমার খরচও লাগাতার বেড়েই চলেছে।” দ্রুত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল শুরু না হলে ভারতের বাসমতি চাল রপ্তানি এবং পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
বড় বাজারগুলিতে ভারতের আধিপত্য ও আটকে থাকা চালের পরিমাণ
রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ় প্রণালীর অনিশ্চয়তার জেরে গুজরাটের বন্দরগুলিতে প্রায় ৫ লক্ষ টন চাল (যার মধ্যে বড় অংশই বাসমতি) স্তূপাকার হয়ে আটকে রয়েছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় চাল ক্রেতা দেশগুলির চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে থাকে:
সৌদি আরব: ভারত থেকে প্রতি বছর প্রায় ১২ লক্ষ টন বাসমতি চাল আমদানি করে সৌদি আরব, যা বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় বাসমতি বাজার।
ইরান: এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইরান, যেখানে গত অর্থবর্ষে প্রায় ৮ লক্ষ টন বাসমতি চাল রপ্তানি হয়েছিল।
কলকাতার চাল রপ্তানিকারক সংস্থা ‘রাইস ভিলা’-র সিইও সুরজ আগরওয়ালের মতে, দীর্ঘ পথ ঘুরে জাহাজ চলাচল করায় পরিবহণ খরচ হু হু করে বাড়ছে, যার ফলে পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপের বাজারে ভারতীয় চালের দাম আরও মহার্ঘ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমস্ত বাধা সত্ত্বেও রপ্তানিতে পজিটিভ গ্রোথ
এতকিছুর পরেও ভারতীয় চাল রপ্তানির গ্রাফটি কিন্তু এককথায় চমকপ্রদ। সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে চাল রপ্তানি ৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৩০৩ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
বিশেষ করে শুধু জুন মাসেই ভারত একশো কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের চাল রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। পশ্চিম এশিয়ার কিছু অংশে উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমায় উপসাগরীয় দেশগুলিতে সরবরাহ ফের স্বাভাবিক হওয়ার ফলেই এই ইতিবাচক চিত্রটি উঠে এসেছে। উল্লেখ্য, এর আগের অর্থবর্ষে (২০২৫-২৬) বাসমতি ও নন-বাসমতি মিলিয়ে ভারতের মোট চাল রপ্তানির মূল্য ৭.৫ শতাংশ কমে ১,১৫৩ কোটি ডলারে নেমেছিল। তবে গত এক দশক ধরে বিশ্ব চাল বাণিজ্যের প্রায় ৪৫ শতাংশ নিজেদের দখলে রেখে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চাল রপ্তানিকারক দেশের তকমা ধরে রেখেছে ভারত।