পৃথিবী থেকে একদিনের জন্য গায়েব বিদ্যুৎ! ধ্বংসের মুখে সভ্যতা, ঘটবে কি মহাপ্রলয়?

ভাবুন তো একবার, পৃথিবী থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল বিদ্যুৎ! স্মার্টফোনের অ্যালার্ম আর বাজছে না, কফি মেকার নিথর, আর শহরের জলের পাইপলাইনগুলোও স্তব্ধ। মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়া—এই দৃশ্যটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও, বাস্তবে এটি এক কল্পনাতীত মহাবিপর্যয়ের নামান্তর। ৮০০ কোটি মানুষের এই আধুনিক পৃথিবী বিদ্যুতের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎহীনতা আমাদের সভ্যতাকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিতে পারে।

বিদ্যুৎ ছাড়া এক দিনের পৃথিবী মানেই এক অর্থনৈতিক সুনামি। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। বিদ্যুতের অভাবে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যাবে শেয়ার বাজার, ব্যাঙ্ক লেনদেন এবং এটিএম পরিষেবা। ডিজিটাল পেমেন্ট অসম্ভব হয়ে পড়ায় সুপারমার্কেট থেকে সাধারণ দোকান—সবই বন্ধ হয়ে যাবে। কারখানাগুলোতে উৎপাদন থমকে গিয়ে বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় খাদ্যদ্রব্য পচে যাবে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট ও অস্থিরতা তৈরি করবে। বিদ্যুৎ যে আধুনিক বিশ্ববাণিজ্যের প্রাণভোমরা, সেদিন তা হাড়েমজ্জায় উপলব্ধি করবে মানবজাতি।

জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার নিরিখে পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ। আধুনিক হাসপাতালের ভেন্টিলেটর, ডায়ালিসিস মেশিন বা অপারেশন থিয়েটারের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বিদ্যুৎ ছাড়া অকেজো। জেনারেটর দিয়ে খুব বেশি হলে কয়েক ঘণ্টা কাজ চালানো সম্ভব। ফলে হাসপাতালের বেডগুলোতে মৃত্যুর মিছিল নামবে। পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মহামারী ছড়িয়ে পড়বে। অন্ধকার রাতে পুলিশি টহল বা জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের গ্রাফ হু হু করে বাড়বে। শহরগুলো পরিণত হবে এক অন্ধকার উপত্যকায়, যেখানে মানুষের নিরাপত্তা থাকবে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা ভাবলে আতঙ্কে শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত নামে। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন—সবই সেদিন কেবল খেলনা হয়ে থাকবে। এক দেশ অন্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তথ্য পাওয়ার কোনো মাধ্যম না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে ব্যাপক আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি। আপনজনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেবে। সোশ্যাল মিডিয়া শান্ত, তথ্যপ্রযুক্তির জগত নিথর—পুরো বিশ্ব সেদিন পরিণত হবে এক বিশাল বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জে।

এই কাল্পনিক অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে, প্রযুক্তির শিখরে বসেও আমরা কতটা ভঙ্গুর। আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি মুহূর্ত এখন বিদ্যুতের ওপর ভিত্তি করে চলছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ ছাড়া একটি দিন অতিবাহিত করা মানে সভ্যতার গতিপথ উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। এই ভয়াবহতা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে বিকল্প শক্তি এবং পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। মানুষ বুঝবে, উন্নয়নের দম্ভ যতই থাকুক, প্রকৃতির বা কৃত্রিম কোনো বিপর্যয়ে বিদ্যুৎহীন এই পৃথিবী কতটা অসহায়। একদিনের অন্ধকার হয়তো আমাদের শেখাবে, আগামীর পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে শক্তির উৎসগুলো কতটা শক্তিশালী এবং সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।