পূর্ব বর্ধমানের ইস্পাত কারখানায় ফের তীব্র বিস্ফোরণ! লোহা গলানোর ভাটি ফেটে জখম দুই শ্রমিক, চরম অসন্তোষ!

পশ্চিম বর্ধমান ও পূর্ব বর্ধমান শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ফের এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হলো। পূর্ব বর্ধমান জেলার পালিতপুরের একটি বেসরকারি ইস্পাত কারখানায় ফের অত্যন্ত ভয়াবহভাবে চুল্লিতে বিস্ফোরণের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার গভীর রাতে লোহা গলানোর চুল্লি বা ভাটি হঠাৎ করেই প্রচণ্ড শব্দে ফেটে যাওয়ার ফলে সেখানে কর্মরত দুই শ্রমিক মারাত্মকভাবে জখম হন। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো কারখানায় মুহূর্তের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় বর্ধমান থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং তারা অবিলম্বে আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে। বর্তমানে পুলিশ ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য চুল্লির চারপাশ খতিয়ে দেখে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে।

এই মর্মান্তিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারখানার ক্ষুব্ধ অন্যান্য শ্রমিকরা কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেহাল দশার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের জোরালো অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই কারখানার এই ত্রুটিপূর্ণ চুল্লিতে যান্ত্রিক গোলযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের তীব্র অভাব এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক গাফিলতির বিষয়টি কারখানা কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হচ্ছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ সমস্ত সতর্কতা উড়িয়ে দিয়ে বিষয়টিতে কর্ণপাত করেনি এবং কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। শ্রমিকদের স্পষ্ট দাবি, যেখানে তাঁরা প্রতিদিন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করেন, সেখানে তাঁদের সুরক্ষার জন্য কেবল নামমাত্র হেলমেট ও সেফটি জুতো ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে চুল্লির মতো সংবেদনশীল জায়গায় কাজ করতে হয়, তার সার্বিক প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ন্যূনতম উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

কারখানার এক কর্মরত শ্রমিক রামদেব পাসোয়ান সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, “নিয়মিতভাবে ভাটি বা চুল্লি পরীক্ষা করা হয় না। অনেক সময় রক্ষণাবেক্ষণকারী টেকনিক্যাল টিমের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি চুল্লি চালু করে দেওয়া হয়। চুল্লির অন্দরে যে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে, তা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো সত্ত্বেও তা সম্পূর্ণ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। শ্রমিকদের অমূল্য জীবনকে সম্পূর্ণ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ কেবল উৎপাদন ও মুনাফা বাড়ানোর ওপর অন্ধের মতো জোর দিচ্ছে।” তাঁর দ্ব্যর্থহীন দাবি, কারিগরি সমস্ত ত্রুটি পুরোপুরি সারাই না করে কোনো অবস্থাতেই এই ধরনের বিপজ্জনক ভাটি চালু করা উচিত নয়।

শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর আগেও এই একই কারখানায় একাধিকবার চুল্লি বিস্ফোরণের মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে। অতীতে ঘটে যাওয়া এমন বহু দুর্ঘটনায় অনেক শ্রমিককে অকালেই প্রাণ হারাতে হয়েছে কিংবা চিরতরে পঙ্গু হতে হয়েছে। তাই অবিলম্বে এই কারখানায় শ্রমিকদের সুরক্ষার স্বার্থে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার পাশাপাশি, প্রতিটি ভাটি বা চুল্লি পুনরায় চালুর আগে বাধ্যতামূলকভাবে প্রযুক্তিগত পরীক্ষা চালানোর জোরালো দাবি তুলেছেন তাঁরা। এদিকে, এই চাঞ্চল্যকর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান বিশিষ্ট বিজেপি নেতা তথা বর্ধমান উত্তর বিধানসভার পরাজিত প্রার্থী সঞ্জয় দাস। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তীব্র আক্রমণ শানিয়ে অভিযোগ করেন, “গত মাত্র এক বছরের মধ্যে এই একই ইস্পাত কারখানায় পরপর তিনবার ভাটি বিস্ফোরণের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। কারখানাটির ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান এবং পরিচালন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও দুর্নীতির কারণেই বারবার নিরীহ শ্রমিকদের এমন বিপদের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাছাড়া কর্মীরা তাঁদের নিয়মিত ও ন্যায্য বেতন থেকেও বঞ্চিত হন।” তিনি অবিলম্বে এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় তদন্ত এবং সমস্ত দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও জীবনের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে জোরালো আবেদন জানানো হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। যদিও এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় ইস্পাত কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো রকম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty