পুরুষদের চেয়ে নারীদের ঘুম বেশি প্রয়োজন কেন? চিকিৎসকদের চাঞ্চল্যকর তথ্য জানলে চমকে যাবেন!

প্রতিদিনের ক্লান্তিকর জীবন থেকে মুক্তি পেতে এবং শরীরকে চাঙ্গা রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম সকলের জন্যই অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমাদের চারপাশের বাস্তব চিত্রটা একটু খেলাই দেখলে বোঝা যায়, সকালের অ্যালার্ম বাজার বহু আগেই অধিকাংশ ঘরের মহিলাদের ঘুম ভেঙে যায়। সংসার সামলানো, বাচ্চাদের স্কুল বা কলেজের টিফিন তৈরি করা, ঘরকন্নার চাপ এবং তার সঙ্গে অফিসের কাজের তাড়া—সব মিলিয়ে কাকভোরে ঘুম থেকে ওঠাটা যেন তাঁদের জীবনের এক বাঁধা ধরা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজারো কাজের চাপে বহু নারীই দিনের বেলা ঠিকমতো একটু শুয়ে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগটুকুও পান না। অথচ চিকিৎসা বিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের গবেষণা সম্পূর্ণ উল্টো কথাই বলছে! সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, যেখানে বলা হয়েছে পুরুষদের তুলনায় নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সতেজ রাখতে কিছুটা বেশি পরিমাণে ঘুমের একান্ত প্রয়োজন হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত এবং বিশ্বমানের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক’ (Cleveland Clinic)-এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে যে, একজন সাধারণ পুরুষের তুলনায় একজন নারীর প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১১ মিনিট বেশি ঘুমের দরকার পড়ে। এই বাড়তি এগারো মিনিটের সময়সীমা শুনতে অত্যন্ত অল্প মনে হলেও, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং জৈবিক চাহিদার দিক থেকে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বিশেষজ্ঞরা এও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বিছানায় শুধু কতক্ষণ শুয়ে কাটানো হলো সেটাই আসল কথা নয়, বরং সেই ঘুমটা কতটা গভীর ও মানসম্মত হলো, সেটাই শরীরের আসল নিরাময় হিসেবে কাজ করে।
নারীদের শরীরে কেন বাড়তি ঘুমের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু নির্দিষ্ট জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ। প্রথমত, হরমোনের ওঠানামা: নারীদের শরীরে বিভিন্ন বয়সে নানা শারীরিক পরিবর্তন লেগেই থাকে। পিরিয়ডের যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলো, গর্ভাবস্থা কিংবা মেনোপজের মতো শারীরিক পরিবর্তনের সময়ে হরমোনের ব্যাপক তারতম্য ঘটে। এর ফলে রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না এবং ঘুম অত্যন্ত পাতলা ও হালকা হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, মাল্টিটাস্কিং বা একসঙ্গে একাধিক কাজের চাপ: অফিস ও সংসার সামলাতে গিয়ে একসঙ্গে বহু কাজ একসঙ্গে করতে হয়, যার ফলে মহিলাদের মস্তিষ্ককে পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি খাটতে হয়। সারাদিনের এই মানসিক ও শারীরিক ধকলের পর মস্তিষ্ককে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে বাড়তি বিশ্রামের দরকার পড়ে। তৃতীয়ত, ঘন ঘন ঘুম ভাঙার সমস্যা: রাতের বেলা ছোট বাচ্চার খেয়াল রাখা কিংবা সামান্য টুকিটাকি শব্দেও অধিকাংশ মহিলার গভীর ঘুম বারবার ভেঙে যায়। মাঝরাতে এই ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে শুয়ে থাকার সময় বাড়লেও আসল গভীর ঘুমটা আর হয় না।
দিনের পর দিন এই ধরনের ঘুমের ঘাটতি চলতে থাকলে শরীরের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, শরীরে তীব্র ক্লান্তি জমে থাকা এবং সামগ্রিক কর্মক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তাই বিশেষজ্ঞরা রাতে ঘুমের মান ভালো করতে কিছু জরুরি অভ্যাসের কথা বলেছেন: প্রথমত, রাত জেগে অতিরিক্ত মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ স্ক্রিন দেখার বদঅভ্যাস অবিলম্বে বদলাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সন্ধ্যার পর থেকে অতিরিক্ত ক্যাফেনযুক্ত চা বা কফি পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তৃতীয়ত, রাতে শোওয়ার আগে খুব ভারী খাবার না খেয়ে হালকা ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করা শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী। চতুর্থত, প্রতিদিন রাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমোতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
সংসার ও পেশাগত দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াটাও প্রতিটি নারীর জন্যই সমানভাবে জরুরি। তাই পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুমকে অবহেলা না করে নিজের শরীর ও সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় আলাদা করে বের করে নেওয়া দরকার।