পুরীর রথের দড়ি ছিঁড়ে বিপত্তি! শ্রীচৈতন্যের নির্দেশে বর্ধমানের এই গ্রাম থেকে যেত বিশেষ ‘পট্টডোরী’

পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুরের কুলীনগ্রাম। এই গ্রামের সঙ্গে জগন্নাথদেবের সম্পর্কের মূলে রয়েছে এক পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনী, যা আজও ভক্তদের মনে বিস্ময় জাগায়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রত্যক্ষ নির্দেশেই একসময় কুলীনগ্রাম থেকে প্রতিবছর পুরীর রথযাত্রার জন্য বিশেষ ‘পট্টডোরী’ বা দড়ি পাঠানো হতো।

কথিত আছে, একবার রথযাত্রার সময় পুরীতে জগন্নাথদেবের রথের দড়ি হঠাৎ ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেই সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই অনভিপ্রেত ঘটনায় ব্যথিত ও বিচলিত মহাপ্রভু কুলীনগ্রামের চৈতন্যভক্ত লক্ষ্মীকান্ত বসুকে ডেকে পাঠান। তিনি নির্দেশ দেন, “আজি হইতে তুমি পট্টডোরীর সেবাইত। প্রতি অব্দ আসিবে তুমি পট্টডোরী লইয়া।” সেই নির্দেশ মেনে লক্ষ্মীকান্ত বসু এবং অন্যান্য চৈতন্যভক্তরা নামসংকীর্তন করতে করতে পায়ে হেঁটে পুরীতে পট্টডোরী পৌঁছে দিতেন। রথের দিন সেই পবিত্র দড়ি ব্যবহারের বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

মন্দিরের প্রধান পুরোহিত শচীনন্দন মুখোপাধ্যায়ের কথায়, এই প্রথা দীর্ঘকাল ধরে চলেছিল। প্রথমে পট্টডোরী সরাসরি পুরীতে পাঠানো হতো। পরবর্তীতে যখন মূল দড়ি পাঠানো সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি, তখন কুলীনগ্রাম থেকে পাট ও শণ দিয়ে তৈরি বিশেষ উপকরণ পাঠানো হতো, যা পুরীর মূল রথের দড়ির সঙ্গে স্পর্শ করিয়ে সেই ঐতিহ্য রক্ষা করা হতো। কালের প্রবাহে বসু পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় একসময় সেই প্রথা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

কুলীনগ্রামেই লক্ষ্মীকান্ত বসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জগন্নাথ মন্দির এবং এখান থেকেই শুরু হয়েছিল রথযাত্রা উৎসব। বর্তমানে এই গ্রামের রথযাত্রা ব্যাপক জনপ্রিয়। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু, ১৬ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের কাঠের রথে ছয়টি লোহার চাকা থাকে। রথের দিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সমাগম হয় এখানে। গ্রামবাসী গৌতম ভট্টাচার্য জানান, “আমাদের রথের ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন ও গৌরবময়। সরকারি সহায়তা পেলে এই উৎসবের প্রসার আরও বৃদ্ধি পাবে।”

গ্রামের রীতি অনুযায়ী, বিগ্রহগুলোকে রথের চারপাশে সাতবার পরিক্রমা করিয়ে রথে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিকেলে রথ টেনে নিয়ে যাওয়া হয় কুলীন গ্রামের রথতলায়, যা ‘মাসির বাড়ি’ বা রঘুনাথ জিউয়ের মন্দির নামে পরিচিত। উল্টো রথ পর্যন্ত দেবতারা সেখানেই অবস্থান করেন। এরপর উল্টো রথের দিন একই আচার মেনে তাঁদের জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। কুলীনগ্রামের এই রথযাত্রা আজও শ্রীচৈতন্যের আশীর্বাদ ও লক্ষ্মীকান্ত বসুর ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে চলেছে। ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা এই অজানা যোগসূত্রটি আজও এই গ্রামকে পুরীর রথযাত্রার সঙ্গে এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে।