পুত্রসন্তানের চাওয়াতেই চরম পরিণতি! জঘন্য কান্ডে উত্তর ২৪ পরগনার মামুদপুরে তীব্র উত্তেজনা!

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মামুদপুর অঞ্চলে কন্যাসন্তান প্রসবকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ ও অমানবিক ঘটনার সাক্ষী থাকল স্থানীয় বাসিন্দারা। পরপর দুটি কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে মাত্র দু’মাসের এক নিষ্পাপ শিশুকন্যাকে নির্মমভাবে হত্যা করে বাড়ির পাশের জঙ্গলে পুঁতে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তার নিজের বাবা ও দাদুকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই লোমহর্ষক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশি হস্তক্ষেপে মাটি খুঁড়ে ওই মৃত শিশুকন্যার দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য তা ব্যারাকপুর মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত এবং পুলিশ প্রশাসন মারফত জানা গিয়েছে যে, জগদ্দল থানার অন্তর্গত মামুদপুর পঞ্চায়েতের দেবক বড়পুকুর এলাকার বাসিন্দা অপূর্ব বন্দ্যোপাধ্যায় ও সমাপ্তি বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসারে বিয়ের পর প্রথমবার যখন সমাপ্তি সন্তানসম্ভবা হন, তখন থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পুত্রসন্তানের প্রবল আশা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাপ্তি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এরপর কেটে গেছে দুটি বছর এবং সমাপ্তি পুনরায় সন্তানসম্ভবা হন। সেই সময় পরিবারের পক্ষ থেকে পুনরায় জোরদার দাবি তোলা হয় যে এবার যেন একটি পুত্রসন্তানই জন্ম নেয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দ্বিতীয়বারও সমাপ্তি একটি কন্যা সন্তানেরই জন্ম দেন। পুত্রসন্তান না হওয়ার কারণে এই পরিবারে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং এতটাই অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল যে, সমাপ্তি যখন দ্বিতীয় কন্যাসন্তান প্রসব করেন, তখন হাসপাতালের সদ্যজাত শিশু ও মাকে দেখতে পরিবারের কেউ এমনকি হাসপাতালেও যাননি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গিয়েছে যে, সমাপ্তির দ্বিতীয় সেই নবজাতক শিশুকন্যাটির বয়স হয়েছিল প্রায় দু’মাস। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে গত দুই থেকে তিন দিন ধরে শিশুটি শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ ছিল। কিন্তু ঘটনার মূল মোড় নেয় বুধবার সকালে, যখন গোটা গ্রামে আচমকাই এই মর্মে খবর রটে যায় যে, ওই দু’মাসের শিশুকন্যাটিকে তার নিজের বাবা ও দাদু মিলে শ্বাসরোধ করে বা অন্য কোনো উপায়ে মেরে ফেলে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছেন। এই রোমহর্ষক খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই সমস্ত প্রতিবেশীরা একত্রিত হয়ে সোচ্চার হন এবং প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। দ্রুত খবর পাঠানো হয় স্থানীয় থানায়। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং মৃত শিশুর দাদু বিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাবা অপূর্ব বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে ওই জঙ্গলে তল্লাশি চালায়। পরবর্তীতে ধৃত অপূর্ব ও বিকাশ পুলিশকে দেখিয়ে দেয় ঠিক কোন জায়গাটায় শিশুকন্যাটিকে পোঁতা হয়েছিল। এরপর পুলিশ মাটি খুঁড়ে ওই মৃত শিশুর দেহ উদ্ধার করে ব্যারাকপুর মহকুমা হাসপাতালে ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে পাঠায়।
এই পৈশাচিক ঘটনা প্রসঙ্গে এলাকার এক প্রতিবেশী মহিলা চন্দ্রানী মণ্ডল অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “আজ সকালবেলা আমরা হঠাৎ খবর পেলাম যে বাচ্চাটিকে তার নিজের বাবা ও দাদু মিলে মেরে ফেলে মাটিতে পুঁতে দিয়েছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে তাদের কাছে জানতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অভিযুক্তরা আমাদের সাফ জানিয়ে দেয় যে শিশুটির নাকি স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। যদি সত্যি সেটাই স্বাভাবিক মৃত্যু হতো, তবে কেন তারা প্রতিবেশীদের কাউকে না জানিয়ে এত তড়িঘড়ি গোপনে মাটিতে পুঁতে দিল? আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং চাই পুলিশ এই ঘটনার গভীর তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিক।”
অন্যদিকে, এই গোটা ঘটনার কেন্দ্রে থাকা মৃত শিশু কন্যার মা সমাপ্তি বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “আমার মেয়েটা গত দুই-তিন দিন ধরে অসুস্থ ছিল। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি দেখি ওর সারা শরীর একেবারে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে এবং ও কোনোভাবেই শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে না। আমি আকুল হয়ে মেয়েকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্বামী ও শ্বশুরমশাই আমার সেই কথায় কান দেননি এবং আমাকে হাসপাতালে যেতে দেননি। তারা জোর করে আমার কোল থেকে মৃত মেয়েকে কেড়ে নিয়ে এসে বাড়ির পাশের জঙ্গলে পুঁতে দিয়েছেন।”
প্রতিবেশীদের করা অভিযোগের বিষয়ে সমাপ্তি আরও জানান, “প্রতিবেশীরা এখন আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন যে আমরাই বুঝি শ্বাসরোধ করে আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছি। কিন্তু এই অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্যি নয়। একজন মা হয়ে কোনোদিনই কোনো মা নিজের দু’মাসের অবুঝ শিশুকে নিজ হাতে মেরে ফেলতে পারেন না।” যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের আনা অভিযোগ এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ মৃত শিশুকন্যার দাদু বিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বাবা অপূর্ব বন্দ্যোপাধ্যায়কে কঠোর আইনি পদক্ষেপে গ্রেফতার করেছে এবং ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছে।