হাই কোর্টে বড় ধাক্কা সিপিএম নেতা লাহেক আলির! রক্ষাকবচের আর্জি খারিজ করে কী নির্দেশ দিল বেঞ্চ?

বারুইপুরের সূর্যপুরে চাঞ্চল্যকর নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভ, অশান্তি এবং হিংসার মামলায় ফের বড় আইনি বিপাকে পড়লেন সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য তথা বারুইপুর পশ্চিমের প্রাক্তন বিধানসভা প্রার্থী লাহেক আলি। কলকাতা হাইকোর্টে তাঁর দায়ের করা রক্ষাকবচের মামলা সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দিয়েছে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ। ফলে এই হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক মামলায় আইনি স্বস্তি তো দূরঅস্ত, বরং সিপিএম নেতার আইনি লড়াইয়ের পথ আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠল।
এদিন কলকাতা হাইকোর্টের শুনানিতে লাহেক আলির পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে তাঁর আইনজীবী অভিষেক হালদার আদালতের নজর আকর্ষণ করে জানান যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের গোষ্ঠীর তৈরি করা মিথ্যে তথ্যের তকমায় এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বানিয়েই বারুইপুর কাণ্ডে তাঁর মক্কেলকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতের কাছে এই গোটা বিষয়টি মানবিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হয়। কিন্তু সমস্ত সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, এই মামলার অন্যতম মূল আবেদন ছিল পুলিশের গ্রেফতারি থেকে আইনি রক্ষাকবচ অর্জন করা। কিন্তু যেহেতু অভিযুক্ত ইতিমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে গিয়েছেন, তাই গ্রেফতারির পরবর্তী এই পর্যায়ে এই ধরণের মামলার শুনানি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন ও অবান্তর। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে এই মুহূর্তে এই বিষয়ে হাইকোর্টের একক বেঞ্চ কোনোভাবেই কোনো রূপ হস্তক্ষেপ করবে না এবং মামলাকারীকে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ও উপযুক্ত নিচুতলার আদালতেই যথাযথ আবেদন করতে হবে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার বহুল আলোচিত সূর্যপুর কাণ্ডে গ্রেফতার হওয়া সিপিএম নেতা লাহেক আলির ৮ দিনের পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর তাঁকে ফের কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় বারুইপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়েছিল। সেদিনের শুনানিতে মামলার তদন্তের স্বার্থে পুলিশের পক্ষ থেকে আরও ৬ দিনের পুলিশি হেফাজতের জোরালো আবেদন জানানো হয়েছিল। উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ সওয়াল ও তর্তকের পর বারুইপুর মহকুমা আদালতের বিচারক ৬ দিনের পরিবর্তে অভিযুক্তকে আরও ৩ দিনের পুলিশি পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন। পুলিশ সূত্রে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে জানানো হয়েছে যে, সূর্যপুর এলাকায় সংগঠিত সরকারি ও রেল সম্পত্তি ভাঙচুর, নজিরবিহীন রাস্তা অবরোধ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য পলাতক অভিযুক্তদের নির্দিষ্ট ভূমিকা ও পরিচয় সম্পর্কে আরও গভীর তথ্য সংগ্রহের জন্যই এই অতিরিক্ত হেফাজতের অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।
পুলিশের তদন্তকারী আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকায় ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত ঘটনার প্রতিবাদে চলা বিক্ষোভ ও তীব্র হিংসার সময়ে সিপিএম নেতা লাহেক আলি স্বয়ং ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের স্পষ্ট দাবি, সেদিন লাহেক আলির প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের ফলেই সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরম রূপ ধারণ করে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে—বিক্ষোভের নামে বড়সড় অশান্তিতে উস্কানি দেওয়া, বিপজ্জনক অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে সরাসরি যুক্ত থাকা, গণপিটুনিতে খুনের ঘটনায় অপরাধমূলক প্ররোচনা প্রদান, বেআইনি জমায়েত করে এলাকায় সুপরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা ছড়ানো, সরকারি ও রেলের বিশাল সম্পত্তি ভাঙচুর এবং ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীদের সরকারি ডিউটি পালনে বাধা দেওয়া এবং তাদের ওপর সরাসরি হামলা চালানো, এবং সর্বপরি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও হিংসা ছড়ানোর পাশাপাশি জনমানসে ধর্মীয় অনুভূতিতে গুরুতর আঘাত করা।
যদিও পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনা এই সমস্ত বিস্ফোরক অভিযোগ প্রথম থেকেই একসরে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এসেছেন ধৃত সিপিএম নেতা লাহেক আলি। তিনি দাবি করেছেন যে তাঁর বিরুদ্ধে আনা এই সমস্ত আইনি মামলা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতেই এই মিথ্যা ফাঁসানো হয়েছে। তবে হাই কোর্টে রক্ষাকবচ খারিজ হওয়া এবং বারে বারে পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে আগামী দিনে লাহেক আলির আইনি লড়াই যে আরও বেশি জটিল ও কঠিন হতে চলেছে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই।