নিট বিতর্কের তীব্র আঁচ! বাধ্য হয়ে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ডিলিট করলেন শিক্ষামন্ত্রীর মেয়ে নৈমিষা প্রধান!

দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একের পর এক বেনিয়ম, দুর্নীতি এবং বহুল আলোচিত নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যখন সারা দেশ তীব্র ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই এই বিতর্কের কালো ছায়া এসে সরাসরি পড়ল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ব্যক্তিগত পরিবারেও। দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ ও ক্ষোভের জেরে সোশ্যাল মিডিয়ায় চরম কড়া সমালোচনা এবং মাত্রাতিরিক্ত ট্রোলিংয়ের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি পুরোপুরি বন্ধ (Deactivate) করে দিতে বাধ্য হলেন খোদ শিক্ষামন্ত্রীর কন্যা নৈমিষা প্রধান। প্রশাসনিক নীতির বিরোধিতার জেরে একজন রাজনীতিকের পরিবারের ওপর যেভাবে সাইবার আক্রমণ নেমে এল, তা নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক ও ডিজিটাল মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত বেশ কিছুদিন ধরে নিট সহ দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও অনিয়ম নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে জোরালো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি-সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। রাজধানী দিল্লির রাজপথে বিগত প্রায় একমাস ধরে লাগাতার আন্দোলন চলছে, যেখানে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থী অংশ নিয়েছেন। ঠিক এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নেটিজেনদের একাংশ শিক্ষামন্ত্রীর নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে তাঁর পরিবারকে নিশানা করেন এবং খুঁজে বের করেন নৈমিষা প্রধানের ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল। এরপরই তাঁর বিভিন্ন ছবি ও পোস্টের কমেন্ট সেকশনে উপচে পড়তে থাকে তীব্র ক্ষোভ, কটূক্তি এবং অনৈতিক আক্রমণের বন্যা।
ট্রোলারদের মূল আক্রমণের নিশানায় ছিল নৈমিষার উচ্চশিক্ষা এবং তার বিদেশ গমন। সোশাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তোলা হয় যে, দেশের শিক্ষামন্ত্রী নিজে যখন গোটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার শীর্ষ দায়িত্বে আসীন, তখন তাঁর নিজের সন্তান কেন পড়াশোনার জন্য সুদূর বিদেশে পাড়ি দিলেন? ভারতের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর কি তবে মন্ত্রীর পরিবারেরই কোনো আস্থা নেই? উল্লেখ্য, নৈমিষা প্রধান ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য টাফটস ইউনিভার্সিটির ‘ফ্লেচার স্কুল’ থেকে তাঁর উচ্চতর আইন ডিগ্রি বা এলএলএম (LLM) সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে ‘ইউএস-ইন্ডিয়া স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ ফোরাম’-এ কর্মরত রয়েছেন। ব্যক্তিগত কৃতিত্বের এই জায়গাটিকে অস্বীকার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাগাতার রাজনৈতিক ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়।
এই বিতর্কের আঁচ কেবল নৈমিষার ব্যক্তিগত প্রোফাইলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর পরিধি আরও প্রসারিত হয়। ক্ষুব্ধ নেটিজেনদের অনেকে তাঁর সাবেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘টাফটস ইউনিভার্সিটি’র অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া পেজেও গিয়ে মন্তব্য করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দাবি তোলেন। পরবর্তীতে রাজধানী দিল্লিতে পুলিশ প্রশাসন আন্দোলনকারী ছাত্রদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ করলে, অনলাইনে এই ট্রোলিং ও হয়রানির মাত্রা আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। এর জেরে চরম মানসিক অস্বস্তি এড়াতে তিনি তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করতে বাধ্য হন।
তবে এই গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে এবং সমাজ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল মানুষ যেমন শিক্ষামন্ত্রীর কর্মপদ্ধতি ও নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন, তেমনই অন্য একটি বিশাল অংশ এই ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়েছেন। তাঁদের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হলো, নৈমিষা প্রধান কোনো সরকারি পদে নেই এবং তিনি প্রত্যক্ষভাবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও নন। ফলে একজন মন্ত্রীপতির রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাজের জবাবদিহি তাঁর সন্তানের ওপর চাপানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বা ন্যায়সংগত হতে পারে না।
বিশিষ্ট সাইবার বিশেষজ্ঞ এবং ডিজিটাল রাইটস অধিকারকর্মীরাও এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ‘টার্গেটেড অনলাইন হ্যারাসমেন্ট’ বা সুনির্দিষ্টভাবে সাইবার হয়রানি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, দেশের রাজনীতিকদের নীতিগত ও প্রশাসনিক সমালোচনা করার অধিকার সকলেরই রয়েছে, কিন্তু তাঁদের পরিবার ও সন্তানদের অনলাইন ট্রোলিংয়ের শিকার বানানো কোনো সুস্থ সমাজ বা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার লক্ষণ হতে পারে না। বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের কন্যা নৈমিষার কোনো ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের অস্তিত্ব ইন্টারনেটে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিরোধী দলগুলো যখন একযোগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে চলেছে, তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মহলের সাফ দাবি, বিরোধীরা রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ইস্যুটিকে নিয়ে নোংরা রাজনীতি করছে। সব মিলিয়ে, এই ঘটনাটি ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক প্রতিবাদের শালীনতা এবং তার সীমা ঠিক কোথায় হওয়া উচিত, সেই জটিল প্রশ্নটিকে আবারও জোরালোভাবে সামনে এনে দাঁড় করাল।