পিরিয়ডের দিনে ফ্রিজের ঠান্ডা জল পান করা কি সত্যিই ক্ষতিকর? জানুন চিকিৎসকের চাঞ্চল্যকর ও বৈজ্ঞানিক মতামত

ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় ও পারিবারিক পরিমণ্ডলে মাসিকের সময় বিভিন্ন ধরনের নিয়মনীতি মেনে চলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। দাদি-নানিদের মুখে শোনা এমন অনেক ঘরোয়া টোটকা ও বিধিনিষেধ আমরা আজও অন্ধভাবে বিশ্বাস করে চলি। যার মধ্যে একটি অত্যন্ত প্রচলিত ধারণা হলো, মাসিকের দিনগুলিতে ঠান্ডা জল পান করা বা ঠান্ডা জাতীয় কোনো পানীয় গ্রহণ করা কঠোরভাবে বারণ। বেশিরভাগ নারীরই এমন বিশ্বাস রয়েছে যে, পিরিয়ডের সময় ঠান্ডা জল খেলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বা ব্লাড সার্কুলেশনে গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধারণার নেপথ্যে কতটা সত্যতা রয়েছে, নাকি এটি স্রেফ একটি অমূলক কুসংস্কার?
এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করে জয়পুরের অ্যাপোলো স্পেকট্রা হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মানিনী প্যাটেল জানান যে, মাসিকের সময় ঠান্ডা জল পান করলে পিরিয়ডের রক্তক্ষরণ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিংবা তলপেটের ব্যথা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে—এই সম্পূর্ণ ধারণাটি একটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত বিশ্বাস বা মিথ মাত্র। এই দাবির সপক্ষে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা প্রমাণ নেই। মূলগতভাবে, মাসিকের সময় যে তীব্র ব্যথা ও ক্র্যাম্প অনুভূত হয়, তার প্রধান কারণ হলো শরীরে ঘটে চলা নানা হরমোনের পরিবর্তন এবং জরায়ুর পেশির আকস্মিক সংকোচন। এই পুরো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নামক একটি বিশেষ হরমোন মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে, যা জরায়ুর সংকোচন বাড়িয়ে দিয়ে ব্যথার সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিরিয়ডের এই কঠিন দিনগুলিতে শরীরের ভেতর পর্যাপ্ত পরিমাণে আর্দ্রতা বা হাইড্রেশন বজায় রাখা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করলে ডিহাইড্রেশনের মতো সমস্যা যেমন সহজে প্রতিরোধ করা যায়, তেমনই পিরিয়ড চলাকালীন অতিরিক্ত ক্লান্তি, শারীরিক দুর্বলতা এবং তীব্র মাথাব্যথার মতো উপসর্গগুলিও অনেকাংশে কমাতে সাহায্য করে। মহিলারা তাঁদের নিজস্ব শারীরিক সুবিধা, পছন্দ ও আবহাওয়া অনুযায়ী সাধারণ ঘরের তাপমাত্রার জল কিংবা ঠান্ডা জল—উভয়ই নির্দ্বিধায় পান করতে পারেন।
তবে চিকিৎসকরা এও মনে করিয়ে দেন যে প্রতিটি নারীর শারীরিক গঠন এবং সহ্যক্ষমতা সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র। ঠান্ডা জল পান করার পর যদি কোনো নির্দিষ্ট নারীর ক্ষেত্রে পেটে ভারী ভাব, গ্যাস বা সামান্য অস্বস্তি অনুভূত হয়, তবে তারা অনায়াসেই হালকা কুসুম গরম জল পান করতে পারেন। মাসিকের সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং হাইড্রেটেড থাকার জন্য প্রচুর পরিমাণে জল পান করা অত্যন্ত আবশ্যক। যদি পিরিয়ডের সময় তলপেটে অসহ্য ব্যথা হয়, অতিরিক্ত রক্তপাত ঘটে কিংবা নিয়মিত এই ধরনের সমস্যা লেগেই থাকে, তবে কোনোভাবেই অবহেলা না করে অবিলম্বে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।