পাতে টান পড়তে চলেছে মধ্যবিত্তের! হঠাৎ আকাশছোঁয়া চালের দামে মাথায় হাত সাধারণ মানুষের

দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চালের লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের হেঁশেল সামলাতে গিয়ে ঘাম ছুটে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানের চাল থেকে শুরু করে উন্নত মানের চাল—সবকিছুরই দাম কেজি প্রতি ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত হু হু করে বেড়ে গেছে। বিভিন্ন চালকলের ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে মানের ওপর ভিত্তি করে ২৫ কেজির এক একটি চালের বস্তার দাম সরাসরি ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
মূলত চালের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে একাধিক জোরালো কারণ রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, তামিলনাড়ুর মোট চালের চাহিদার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই আসে প্রতিবেশী রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটক থেকে। কিন্তু চলতি বছর এই রাজ্যগুলিতে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় এবং ধানের ফলন ব্যাপকভাবে মার খাওওয়ায় জোগান মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকেই চালের বাজার অগ্নিগর্ভ হওয়ার প্রধান অন্যতম অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
পাশাপাশি, কর্ণাটকের বিখ্যাত তুঙ্গভদ্রা বাঁধের সেচ এলাকায় জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় সেখানকার স্থানীয় কৃষকদের ধান চাষের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্ণাটকের জনপ্রিয় পোন্নি চালের উৎপাদনে, যা কমায় তামিলনাড়ুর বাজারে তার জোগানও তলানিতে এসে ঠেকেছে। পোন্নি চালের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার পিছনে এটিও একটি অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি পরিবহণ ও আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধিও চালের দাম আকাশছোঁয়া করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়েছে। গত এক বছরে রাসায়নিক সারের দাম যেমন চড়েছে, তেমনই লাগাতার ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে লরির ভাড়াও প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ওপর বস্তার দাম, প্যাকিং খরচ এবং গুদাম ও মিলের শ্রমিকদের মজুরি বাবদ খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উৎপাদন ও পরিবহণের এই সমস্ত অতিরিক্ত খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে সাধারণ ক্রেতাদের পকেট থেকেই খসছে।
এদিকে আবহাওয়া পরিবর্তনের জেরে ঠিকমতো বর্ষা না হওয়া, অনাবৃষ্টি এবং এল নিনোর (El Niño) ক্ষতিকর প্রভাবে দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যে ধানের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জেরে বাজারে নতুন ধানের পর্যাপ্ত জোগান ব্যাহত হয়েছে এবং চালের বাজার চড়া রয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে ভারতীয় চালের বিপুল চাহিদার কারণে দেশের বাজারে অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্র সরকার রফতানির ওপর বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও কৃষক সংগঠনগুলির মতে, রফতানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে কৃষকদের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও কৃষকদের স্বার্থের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন—ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার (FCI) হাতে মজুত থাকা অতিরিক্ত চাল খোলা বাজারে বিক্রি করা, রেশন ও সমবায় দোকানগুলির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে চালের জোগান বাড়ানো, কৃষকদের চাষে উৎসাহ দিতে সঠিক সময়ে আর্থিক সহায়তা দেওয়া এবং ফসল নষ্ট হওয়া রোধ করতে আধুনিক প্রযুক্তির গুদামঘর তৈরি করা।
অবশ্য কিছুটা স্বস্তির খবর শুনিয়েছেন চালকলের মালিক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, চালের এই মূল্যবৃদ্ধি মূলত সাময়িক পরিস্থিতি। তামিলনাড়ুতে আগামী অগাস্টের শেষ দিক থেকে বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে কুরুভাই ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন ধান বাজারে প্রবেশ করলে জোগান স্বাভাবিক হবে এবং চালের দামও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তাঁরা আশা করছেন। তবে আগামী কয়েক মাসের আবহাওয়া, সঠিক বর্ষা এবং ফসলের উৎপাদনই নির্ধারণ করবে যে চালের বাজার কোন দিকে মোড় নেবে।