নিজস্ব ভবন নেই, শিক্ষক অসুস্থ! পশ্চিম মেদিনীপুরে লোকের বাড়িতে রান্না করে খাবার বিলি আইসিডিএস কেন্দ্রের

পশ্চিম মেদিনীপুর, চন্দ্রকোনা: পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা ১ নম্বর ব্লকের শোলা দুই গ্রামের শোলা ৩ নম্বর ২১১ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রটি যেন এক আজব ঠিকানা! খাতায়-কলমে আইসিডিএস সেন্টার থাকলেও সেখানে গেলে কোনো স্থায়ী ভবন দেখতে পাওয়া যায় না। প্রায় আট বছর ধরে নিজস্ব ঘর ছাড়াই চলছে এই কেন্দ্রটি।

অসুস্থ কর্মী, স্বামীর হাতে ভার:

কেন্দ্রটির একমাত্র শিক্ষিকা দীপালী করণ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে কেন্দ্রে আসেন না। তাঁর পরিবর্তে স্বামী যুধিষ্ঠির করণ কোনোমতে কেন্দ্রটি চালান। তিনি গ্রামের প্রতিটি প্রান্তে ঘুরে সকালে লোকের বাড়িতে বা খোলা আকাশের নীচে খাবার রান্না করেন। সেই রান্না করা খাবার টিফিন বাক্সে ভরে সাইকেলে করে নিয়ে এসে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে নাম লেখানো ৫৭ জন শিশু ও প্রসূতির পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেন।

অভিভাবকদের তীব্র ক্ষোভ ও ভয়:

নিজস্ব ঘর না থাকায় এই কেন্দ্রে পড়াশোনার কোনো বালাই নেই। শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ না পাওয়ায় গ্রামবাসীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবক মাম্পিয়া খাতুন ও আতাউল খান’রা বলেন:

“আট বছর ধরে এভাবেই চলছে। আমরা খাবার নিতে আসি ঠিকই, কিন্তু এই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই… এই খাবার আমরা ভয়ে ভয়ে বাচ্চাকে খাওয়াই না। বড়রা খায় বা খাবারটা নিয়ে গিয়ে ফেলে দিই। কারণ খোলা আকাশের নীচেও এই খাবার রান্না হয়। আমরা একটা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র তৈরির দাবি জানাচ্ছি, তাহলে বাচ্চারা এখানে এসে পড়াশোনা ও খাওয়া-দাওয়া করতে পারে। বিডিওকে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।”

কর্মীর স্বামীর অসহায়তা:

আইসিডিএস কর্মীর স্বামী যুধিষ্ঠির করণ বলেন, “আমার স্ত্রী অসুস্থ, তাই আমি পুরোটা দেখভাল করি। দীর্ঘ আট বছর ধরে আমাদের রান্না করার জায়গা নেই। আমি এই বাড়িতে দু’মাস, ওই বাড়িতে দু’মাস—এভাবে বাইরে বাইরে রান্না করে বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিই। বহুবার ঘরের জন্য আবেদন করেছি, শুধু আশ্বাস মিলেছে, কিন্তু কাজ হয়নি।”

রাজনৈতিক চাপানউতোর:

এই বিষয়ে চন্দ্রকোনা-১ ব্লকের বিডিও কিছু বলতে অস্বীকার করলেও, চন্দ্রকোনা-১ পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি সূর্যকান্ত দলুই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের ঘর তৈরি না হওয়ার জন্য সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারকেই দুষেছেন। তিনি বলেন, “এই নিয়ে আমরা বহুবার টেন্ডার ডেকেছি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তার বলপ্রয়োগ করে সমস্ত প্রকল্পের টাকা আটকে রেখেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।”

পালটা কটাক্ষ করে বিজেপির ঘাটাল সাংগঠনিক জেলার সম্পাদক নন্দ নিয়োগ বলেন, “তৃণমূল এখন এসব আইসিডিএস সেন্টার বানায় না, তারা খেলা মেলা নিয়ে মত্ত। এই ব্যাপারটা বর্তমানে মানুষজন বুঝেছে। ২০২৬ সালে মানুষ এগুলি ভালো করে বুঝে সঠিক জায়গায় ভোট দিয়ে উৎখাত করবে তৃণমূলকে।”

ভবন নির্মাণ হলে আইসিডিএস কেন্দ্রের স্থায়ী ঠিকানা হবে ঠিকই, কিন্তু কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব এভাবেই একজন মহিলা কর্মীর স্বামীর উপর থাকবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।