অসচেতনতাই ডেকে আনে মৃত্যু! গরমে হিট স্ট্রোক থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার জাদুকরী টোটকা

তীব্র দাবদাহ এবং আকাশছোঁয়া তাপমাত্রার জেরে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন চারপাশের বাতাসে যেন বইছে আগুনের আঁচ। আবহাওয়া দপ্তরের ঘনঘন সতর্কবার্তার মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হু হু করে বাড়ছে হিট স্ট্রোকের (Heat Stroke) মতো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, গ্রীষ্মকালের এই চরম আবহাওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায়, তখনই মূলত হিট স্ট্রোকের কবলে পড়েন মানুষ। সামান্য অবহেলা বা সচেতনতার অভাবে এই মারণ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে কিডনি ফেইলিওর, মাল্টি-অর্গান ড্যামেজ কিংবা আকস্মিক মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক পরিণতি। তাই সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য এই মুহূর্তে প্রতিটি নাগরিকের চরম সতর্ক হওয়া এবং প্রতিকারের সঠিক উপায়গুলি জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
হিট স্ট্রোক মূলত তখনই ঘটে যখন আমাদের শরীরের নিজস্ব প্রাকৃতিক থার্মোরেগুলেটরি সিস্টেম বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা অতিরিক্ত গরমের কারণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। সাধারণত প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে ঘাম ঝরার মাধ্যমে তাপ বেরিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, আর্দ্রতা বেশি থাকলে সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা দ্রুত ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি ছুঁয়ে ফেলে। অতিরিক্ত দুর্বলতা, তীব্র মাথা ঘোরা, বমি ভাব, পেশিতে টান ধরা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়া হলো হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক ও মারাত্মক সব লক্ষণ। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং যাঁরা দীর্ঘক্ষণ রোদে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাঁরা এই রোগের প্রধান ঝুঁকিতে থাকেন।
এই মারণ আক্রমণ থেকে নিজেকে এবং প্রিয়জনদের সুরক্ষিত রাখতে কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক। প্রথমত, শরীরকে সর্বদা হাইড্রেটেড রাখতে হবে; তীব্র গরমেও সারাদিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার জল, ডাবের জল, ফলের রস এবং নুন-চিনির জল পান করার অভ্যাস করতে হবে। ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। দ্বিতীয়ত, বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই হালকা সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরুন এবং ছাতা, সানগ্লাস কিংবা টুপি ব্যবহার করে সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলুন। তৃতীয়ত, দুপুরের চরম উত্তপ্ত সময়ে (বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত) রোদে ঘোরাঘুরি করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায়, তবে দেরি না করে অবিলম্বে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা বা প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে ছায়াযুক্ত বা কোনো ঠান্ডা, বাতাসের ঘরে সরিয়ে নিয়ে যান এবং তাঁর শরীরের অতিরিক্ত পোশাক শিথিল করে দিন। ঠান্ডা জল দিয়ে তাঁর গা মুছে দিন কিংবা সম্ভব হলে ভেজা তোয়ালে জড়িয়ে দিন, যাতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে আসে। রোগীর জ্ঞান থাকলে তাঁকে অল্প অল্প করে জল বা ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ORS) পান করান। তবে কোনো অবস্থাতেই জ্বর কমানোর ওষুধ বা প্যারাসিটামল সেবন করাবেন না, কারণ এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। লক্ষণ মারাত্মক মনে হলে কালবিলম্ব না করে রোগীকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া আবশ্যক। একটুখানি সচেতনতা ও সঠিক পদক্ষেপই পারে একটি অমূল্য প্রাণকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে।