নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি? পাসপোর্ট নিয়ে সরকারের নতুন নিয়মে আপনার জানা থাকা জরুরি

সম্প্রতি বিদেশ মন্ত্রকের একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা সাধারণ মানুষের প্রচলিত ধারণায় বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। এতদিন অনেকেরই ধারণা ছিল যে, নেভি-ব্লু রঙের ভারতীয় পাসপোর্টই সম্ভবত নাগরিকত্বের সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত প্রমাণ। বিদেশে কনস্যুলার সুরক্ষা নিশ্চিত করা বা আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য এই বুকলেট অপরিহার্য হওয়ায়, এটিকে জাতীয় পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবেই গণ্য করা হতো। কিন্তু সরকার এখন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় পাসপোর্ট নাগরিকত্বের অখণ্ড বা চূড়ান্ত আইনি প্রমাণ নয়।

যদি পাসপোর্ট নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তবে আধার কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো নথিগুলোও যে নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, তা আগেই বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরে স্পষ্ট করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, ঠিক কোন নথিটি একজন ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয়? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর কোনো একটি একক কার্ডে লুকিয়ে নেই, বরং লুকিয়ে আছে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের অধীনে থাকা নির্দিষ্ট সনদের মধ্যে।

বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, নাগরিকত্বের নিরঙ্কুশ প্রমাণ হিসেবে মূলত দুটি নথিকে অকাট্য ধরা হয়: ১. সার্টিফিকেট অফ ন্যাচারালাইজেশন এবং ২. সার্টিফিকেট অফ রেজিস্ট্রেশন। এই নথিগুলো কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (MHA) দ্বারা ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৫ ও ৬ ধারার অধীনে জারি করা হয়। যেসব ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়ার পরও আইনি প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব অর্জন করেন, তাঁদের এই সনদ প্রদান করা হয়।

জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য জন্ম সনদ (Birth Certificate) মৌলিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর ক্ষেত্রে কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে যা জন্মসালের ওপর নির্ভর করে:

২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ থেকে ১ জুলাই ১৯৮৭: এই সময়ের মধ্যে ভারতে জন্ম নিলে বার্থ সার্টিফিকেটই চূড়ান্ত। কারণ, তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী ভারতে জন্ম নিলেই নাগরিকত্ব মিলত।

১ জুলাই ১৯৮৭ থেকে ৩ ডিসেম্বর ২০০৪: এখানে বার্থ সার্টিফিকেটের পাশাপাশি প্রমাণ করতে হবে যে, জন্মের সময় বাবা-মায়ের মধ্যে অন্তত একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।

৩ ডিসেম্বর ২০০৪-এর পরবর্তী সময়: এই ক্ষেত্রে বার্থ সার্টিফিকেটের সাথে প্রমাণ করতে হয় যে, উভয় অভিভাবকই ভারতীয় নাগরিক অথবা একজন ভারতীয় এবং অন্যজন অবৈধ অভিবাসী নন।

বিভ্রান্তি নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আধার কার্ড শুধুমাত্র পরিচয় ও ঠিকানার প্রমাণ, নাগরিকত্বের নয়। অন্যদিকে, ভোটার কার্ড কেবল জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের অধীনে ভোট দেওয়ার অধিকার দেয়। তবে আইনি বিরোধ বা ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে আদালত জমির দলিল, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নথি বা সরকারি রেজিস্টারে সংরক্ষিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকত্ব যাচাই করে। অর্থাৎ, যদি কারো কাছে বিশেষ নাগরিকত্ব সনদ না থাকে, তবে কঠোর আইনি পরিস্থিতিতে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য একাধিক ঐতিহাসিক ও সরকারি নথির ধারাবাহিক উপস্থাপনই একমাত্র পথ। সুতরাং, নাগরিকত্ব প্রমাণের বিষয়টি কেবল একটি কার্ডে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আইনি পরম্পরা ও নথিপত্রের এক জটিল ও সমন্বিত প্রক্রিয়া।