‘ফাবিং’ কী? আপনার ছোট্ট ভুলের খেসারত দিচ্ছে সন্তান, অজান্তেই কি বিষাক্ত করছেন সম্পর্ক?

সন্ধ্যা সাতটা। ড্রয়িং রুমে বাবা সোফায়, মা বিছানায়। মাঝখানে ছয় বছরের ছোট্ট রিয়ান। সে খুব উৎসাহ নিয়ে বাবাকে বলছে, “বাবা, দেখো আমি টাওয়ার বানিয়েছি।” বাবার চোখ তখন মোবাইলের রিলের দিকে। উত্তরে এলো কেবল এক শব্দ—”হুম।” মাকেও ডাকল রিয়ান, কিন্তু মেসেজের নেশায় মগ্ন মা-ও একই কথা বললেন। একটু পরে নিরাশ রিয়ান নিজেই তার সাধের টাওয়ারটা ভেঙে ফেলল। এই দৃশ্যটি আজকের প্রায় প্রতিটি আধুনিক পরিবারের গল্প। বিশেষজ্ঞরা একেই বলছেন “ফাবিং” (Phubbing)—অর্থাৎ ফোন (Phone) এবং অবজ্ঞা (Snubbing) এর মেলবন্ধন। যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তার সামনেই ফোনে ডুবে থেকে তাকে এড়িয়ে যাওয়াই হলো ফাবিং।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা-মায়ের এক মিনিটের ফোন ব্যবহারের নেশা সন্তানের কাছে এক ঘণ্টার একাকীত্বের সমান। এর কুফল সুদূরপ্রসারী:

১. “আমি গুরুত্বপূর্ণ নই”—৫ বছরের শিশু বোঝে না হোয়াটসঅ্যাপ কেন জরুরি। সে শুধু বোঝে—আমি ডাকছি, মা-বাবা তাকাচ্ছে না। বারবার এমন হলে শিশুর মনে গেঁথে যায় যে, তার কথা শোনার মতো কেউ নেই। ফলে সে একাকীত্ব থেকে বাঁচতে নিজেই ফোন বা টিভির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
২. জেদ ও অস্থিরতা: মনোযোগ না পেয়ে শিশু হয় একদম চুপ হয়ে যায়, নয়তো চিৎকার ও ভাঙচুর শুরু করে। বাবা-মা মনে করেন সন্তান জেদি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আসলে সে কেবল চাইছে—”আমাকে একটু দেখো।”
৩. আবেগের অভাব: শিশুরা হাসি, কান্না বা রাগ—মানুষের মুখ দেখে শেখে। বাবা-মা সারাক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে শিশু মানুষের “ইমোশন” পড়তে পারে না। বড় হয়ে সে অন্যদের সাথে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়।
৪. দুষ্টচক্র: বাবা-মা স্ট্রেস কমাতে ফোন ঘাঁটেন, কিন্তু সন্তানের সাথে দূরত্ব বাড়ায় বাড়িতে অশান্তি বাড়ে। তখন শান্তির খোঁজে বাবা-মা আরও ফোনে ডুবে যান।

তাহলে সমাধান কী? বিশেষজ্ঞেরা তিনটি “নো ফোন রুল” মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:

প্রথমত, দিনে অন্তত ২০ মিনিটের “ফুল অ্যাটেনশন টাইম”। ফোন অন্য ঘরে রেখে সন্তানের সাথে সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা বলুন। এই ২০ মিনিটের কোয়ালিটি টাইম তিন ঘণ্টার পাশে বসে ফোন ঘাঁটার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

দ্বিতীয়ত, খাওয়ার টেবিলকে “নো ফোন জোন” করুন। খাওয়ার সময় সবার ফোন বন্ধ থাকুক। শুধু গল্প হোক—”আজ স্কুলে কী হলো?”—এই ছোট ছোট গল্পই শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ভিত গড়ে দেয়।

তৃতীয়ত, নিজে উদাহরণ হোন। সন্তান আপনার কথা শোনে না, আপনাকে অনুসরণ করে। আপনি রিল দেখা বন্ধ করলে, তারাও কার্টুন বা গেমসের দিকে কম ঝুঁকবে।

আমরা সবাই ক্লান্ত, ফোনটা আমাদের কাছে হয়তো ৫ মিনিটের এক মুক্তি। কিন্তু শিশুর কাছে সেই ৫ মিনিট মানে দীর্ঘ সময়ের অবহেলা। মোবাইল ছাড়া পৃথিবী থেমে যাবে না, কিন্তু বাচ্চার সাথে সময় না কাটালে তার শৈশব থমকে যাবে। ফোনটা হাত থেকে সরিয়ে মনটা বাচ্চার কাছে রাখুন; মনে রাখবেন, সে বড় হয়ে গেলে আপনার সময় দেওয়ার জন্য সে আর পাশে থাকবে না।