দেরিতে বিয়েই কি বিপদের কারণ? ভারতের জনসংখ্যায় বড় বদল, চিন্তায় বিশেষজ্ঞ মহল

ভারতে বিয়ের ধারণা ও সামাজিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিয়ে এখন আর নিছক কোনো সামাজিক প্রথা নয়, বরং তা দেশের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেরিতে বিয়ের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। শিক্ষা, ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতনতা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার তাগিদে নারী ও পুরুষ উভয়েই এখন দীর্ঘ সময় পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন। এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে দেশের বর্তমান জনসংখ্যা কাঠামোতে।

সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিন্যাসে এক গভীর পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশু জনসংখ্যার হার বিগত বছরগুলোতে ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর বিপরীতে, ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার বেড়ে ৬৬.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিকদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৯.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভারত ধীরে ধীরে এমন একটি জনতাত্ত্বিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে যেখানে জন্মহার কম এবং প্রবীণ মানুষের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে।

জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিবাহ এবং মাতৃত্বের বয়স বৃদ্ধিই এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ। আগে যেখানে পরিবার বড় হতো, এখন দেরিতে বিয়ের ফলে প্রথম সন্তানের জন্মও হচ্ছে অনেক দেরিতে। এতে পরিবারপ্রতি সন্তানের সংখ্যা কমে আসছে। ভারত সরকারের ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ (SRS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে ভারতের জন্মহার যেখানে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় ৩৬.৯ ছিল, তা ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮.৩-এ। এই জন্মহারের নিম্নমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বয়সের ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

অবশ্য বিয়ের বয়স বৃদ্ধি নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে। নারীরা এখন ক্যারিয়ারে অধিক মনোযোগী হওয়ার সময় পাচ্ছেন। তবে মুদ্রার অন্য পিঠও রয়েছে। মাতৃত্বকে অনেক বেশি বিলম্বিত করার ফলে কিছু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির বিষয়টিও উপেক্ষা করার উপায় নেই। চিকিৎসকদের মতে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মাতৃত্বের ঝুঁকি বাড়তে থাকে, যা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ভারত এক অনন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রাচুর্য দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে, অন্যদিকে নিম্নমুখী জন্মহার ও ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনসংখ্যা ভবিষ্যতে সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। ভারত কি আগামী দিনে ‘এজিং সোসাইটি’ বা প্রবীণদের দেশের দিকে এগোচ্ছে? এই প্রশ্নই এখন সমাজতাত্ত্বিকদের ভাবিয়ে তুলছে। আধুনিক জীবনধারা এবং প্রথাগত পারিবারিক মূল্যবোধের এই সংঘাত কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা নিয়েই এখন নীতিনির্ধারকদের ভাবার সময় এসেছে। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য বজায় রাখতে জনতাত্ত্বিক এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।