তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরমহলে এই মুহূর্তে রীতিমতো ভূমিকম্প। সোমবার লোকসভা ও রাজ্যসভার সাংসদীয় দলের ভাঙন যেন এক বিশাল রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিনের ব্যবধানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। দল থেকে পদত্যাগ করা সুখেন্দুশেখর রায় এবং বিদ্রোহী নেত্রী শতাব্দী রায়ের একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্যে বিদ্ধ হচ্ছে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। তাঁদের কথায় স্পষ্ট, তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এখন চরম সংকটের মুখে।
‘পার্টির কোনো স্ট্রাকচারই রইল না’
রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়ের কথায়, “যেভাবে একের পর এক নেতা-কর্মী দলত্যাগ করছেন, তাতে পার্টির আর কোনো সাংগঠনিক কাঠামোই অবশিষ্ট নেই।” তিনি জানান, গঙ্গাপাড় থেকে শুরু হওয়া তৃণমূলের এই ভাঙন এখন যমুনা পাড়ে এসে বড় আকার নিয়েছে। দলের মূল কাঠামোই ভেঙে পড়েছে এবং তথাকথিত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সদস্যরাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
দিদির বিরুদ্ধে শতাব্দীর বিস্ফোরক অভিযোগ
বিদ্রোহী শতাব্দী রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি সরাসরি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, “আমি এখন দিদিকে আর মানছি না।” শতাব্দীর অভিযোগ, তৃণমূলের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকবার নেতৃত্বকে জানানো সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টে সবসময় বলা হয়েছে, “আমাদের ভুল বোঝানো হচ্ছে।” শতাব্দীর কথায়, “দিদি নেত্রী হিসেবে সবাইকে জলে ডুবিয়ে দিয়েছেন। তৃণমূলের হয়ে এতগুলো লোক লড়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন—কাকে বাঁচাতে পেরেছেন তিনি? নিজের কর্মীদের রক্ষা করার দায় তো দিদিরই ছিল।”
পৃথক ব্লকের পথেই কি বিদ্রোহীরা?
তৃণমূলের মূল ধারার দল থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন এই বিদ্রোহী নেতারা। শতাব্দী রায় স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা তৃণমূলের মূল টিমে আর নেই। তাঁরা আলাদাভাবে কাজ করতে চান। এনডিএ বা অন্য কোনো জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার কথা না বললেও, তাঁরা সংসদে তৃণমূলের থেকে পৃথক একটি ব্লক হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব তৈরি করতে মরিয়া।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একদা যিনি তৃণমূলের শেষ কথা ছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। শতাব্দী রায় কিংবা সুখেন্দুশেখর রায়ের মতো প্রবীণ ও জনপ্রিয় নেতাদের এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে, দলের ভেতরে মমতার প্রতি আনুগত্যের দেওয়াল ভেঙে পড়েছে। দল পরিচালনায় ব্যর্থতা, লাগামহীন দুর্নীতি এবং কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে না পারার অভিযোগ তুলে শতাব্দী রায় যে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তাতে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন দেখার বিষয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভাঙন রুখতে শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেন, নাকি তৃণমূল কংগ্রেস ইতিহাসের পাতায় মিশে যাওয়ার পথে।





