তিন দশক পর গঙ্গার উজানে রূপোলি ইলিশের চমক! নদী পুনরুজ্জীবনে বড় সাফল্য বিজ্ঞানীদের

প্রায় তিন দশক ধরে গঙ্গার মধ্য ও উজানের অংশে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মাছের দেখা না মিললেও, সম্প্রতি দেশের এই প্রধান নদীবক্ষে রূপোলি ইলিশের উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের মতে, নদী পুনরুদ্ধার এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট ICAR-CIFRI-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের চান্দৌলি জেলার মার্কণ্ডেয় মহাদেব মন্দিরের নিকটবর্তী এলাকা থেকে প্রায় তিন দশক পর ৭৪০ গ্রাম ওজনের দুটি ইলিশ উদ্ধার করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, অতীতে ইলিশ মাছ বঙ্গোপসাগর থেকে গঙ্গা নদীপথ বেয়ে সুদূর বারাণসী, প্রয়াগরাজ এবং তারও উত্তরবর্তী অঞ্চলে পরিভ্রমণ করত। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকেই এই পরিযায়ী মাছের স্বাভাবিক চলাচলের পথ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ফলস্বরূপ, গঙ্গার মধ্য ও উজানের জলভাগে ইলিশের সংখ্যায় নজিরবিহীন ধস নামে এবং প্রজাতিটির ওপর নির্ভরশীল নদীতীরবর্তী মানুষ চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। ইলিশের পরিবেশগত, পুষ্টিগত, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করে ব্যারাকপুরের ICAR-CIFRI এবং National Mission for Clean Ganga (NMCG) যৌথ উদ্যোগে একটি দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি গ্রহণ করে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত একটি সমন্বিত কৌশল মাঠে নামানো হয়েছিল। এই কার্যক্রমে নদীর বুকে মাছের পোনা ছাড়া বা রিভার র্যাঞ্চিং, কৃত্রিম প্রজনন, নিষিক্ত ডিম অবমুক্তকরণ এবং ট্যাগের মাধ্যমে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। এই বিশেষ প্রচেষ্টার ফলে ফারাক্কা ব্যারাজের উজানের দিকে প্রায় তিন লাখ পঁচাশি হাজারের বেশি কমবয়সী ও পূর্ণবয়স্ক ইলিশ ছাড়া সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি নিষিক্ত ডিম এবং নয় লাখের অধিক হ্যাচারি উৎপাদিত পোনা নদীর জলে ছাড়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরিচালিত নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, এই ইলিশগুলি উজানের দিকে মির্জাপুর পর্যন্ত সফলভাবে পৌঁছেছে, যা এই জলচর প্রাণীর ঐতিহাসিক বিচরণক্ষেত্র ফিরে পাওয়ার উজ্জ্বল ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের মতো সংবেদনশীল পরিযায়ী প্রজাতির সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি নদীর জলধারার সংযোগ এবং বাসস্থানের উপযুক্ত পরিবেশের অন্যতম প্রধান নির্দেশক। ICAR-CIFRI ও NMCG-এর এই সফল যৌথ উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে, সুসংহত বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সরকারি নীতি সঠিক পথে পরিচালিত হলে নদীর হারানো প্রাণ ফিরে পাওয়া সম্ভব। ইলিশের এই পুনআগমন কেবল জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেনি, বরং নদীকে কেবল জল ব্যবস্থাপনার মাধ্যম না ভেবে একটি জীবন্ত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তাকেও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।