ডলারের দিন শেষ? ব্রিকস সম্মেলনে ভারতকে মুকুট পরালেন বিশ্বনেতারা, জানুন মোদীর ৫ বড় মাস্টারস্ট্রোক!

নয়াদিল্লির মাটিতে সম্প্রতি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলন। ভারতের সুযোগ্য সভাপতিত্বে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন বিশ্ব রাজনীতি এবং ভূ-অর্থনীতিতে এক নতুন এবং অভাবনীয় অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার জাদুতে সব দেশকে একই টেবিলে বসিয়ে ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি ডিক্লারেশন ২০২৬’ পাশ করানো সম্ভব হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের এক বিরাট সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই হাই-প্রোফাইল সম্মেলনে ভারতের মুকুটে কোন ৫টি বড় সাফল্যের মণি যুক্ত হয়েছে, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
প্রথমত, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বকে একজোট করা। এই সম্মেলনে ভারতের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক জয় ছিল বিশ্বমঞ্চে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সমস্ত দেশকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসা। সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় এবং তাদের বেআইনি অর্থ জোগান দেওয়ার মতো গুরুতর বিষয়গুলির তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে সংঘটিত কাপুরুষোচিত জঙ্গি হামলার নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করে এই নিন্দা প্রস্তাবে চিন ও রাশিয়াকেও স্বাক্ষর করতে রাজি করিয়েছে ভারত, যা এক পরম কূটনৈতিক সাফল্য।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্যে বড় ধাক্কা। গ্লোবাল ট্রেডে আমেরিকান ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্রিকসভুক্ত সদস্য দেশগুলির পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রা যেমন রুপি, ইউয়ান এবং রুবলের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর জন্য ভারতের প্রস্তাবিত ‘ব্রিকস পেমেন্ট টাস্ক ফোর্সের’ মাধ্যমে জাতীয় পেমেন্ট সিস্টেমগুলিকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে এবং আন্তঃসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ করা হবে।
তৃতীয়ত, বিশ্বমঞ্চে ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট বা ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থার চরম জয়জয়কার। ভারতের কিউআর কোড কালচার, ইউপিআই এবং আধার-ভিত্তিক ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (DPI)-এর অভূতপূর্ব সাফল্যকে একবাক্যে কুর্নিশ জানিয়েছে গোটা বিশ্ব। এই ভারতীয় মডেলটিকে বাকি ব্রিকস দেশগুলির নিজস্ব ডিজিটাল পরিকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পাস হয়েছে। এই প্রযুক্তি পরস্পরের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটি ‘ব্রিকস রিপোজিটরি ফর ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্লাস্ট্রাকচার’ তৈরিতে সবাই সম্মত হওয়ায় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ক্ষেত্রে ভারত আজ বিশ্বমঞ্চের অবিসংবাদিত নেতার আসনে উন্নীত হয়েছে।
চতুর্থত, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যে ভারতের নেতৃত্ব। স্বাস্থ্যক্ষেত্রের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়েও ভারত নিজের শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশ্বব্যাপী বিশেষ জোর দেওয়ার যে পরিকল্পনা ভারত পেশ করেছিল, তাকে অন্য দেশগুলি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। বেঙ্গালুরুর স্বনামধন্য ‘নিমহ্যান্স’ (NIMHANS) প্রতিষ্ঠানটিকে ব্রিকসের ‘সেন্টারস অফ এক্সেলেন্স’-এর প্রধান সমন্বয় কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, ‘ব্রিকস হেলদি লাইফস্টাইল মিশন’ এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ ভারতের নেতৃত্বেই সফলভাবে চালু হতে চলেছে।
পঞ্চমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (MSMEs) আধুনিকীকরণ। ছোট ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে ‘ইন্ডিয়া সেন্টার ফর ব্রিকস ইন্ডাস্ট্রিয়াল কম্পিটেন্সিজ’ স্থাপনের ঐতিহাসিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ‘জয়পুর কনসেনসাস’-এর সুবাদে দেশের উদীয়মান ছোট ব্যবসায়ীরা আর্থিক সহায়তা এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের মেধা তুলে ধরার সুবর্ণ সুযোগ পাবেন। সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই ব্রিকস সম্মেলনের হাত ধরে ভারত ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর undisputed নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার পাশাপাশি ব্যবসা, প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যের মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল।