ওজন কমালেই গায়েব হবে ডায়াবেটিস ও ফ্যাটি লিভার! মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ওজন হ্রাসের জাদুকরী উপকারিতা!

আজকের আধুনিক ও অনিয়মিত জীবনযাত্রায় টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ—এই দুটি মারাত্মত স্বাস্থ্য সমস্যা যেন ঘরে ঘরে এক অভিন্ন চিত্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া, শরীরের অতিরিক্ত স্থূলতা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের মাত্রা বৃদ্ধিই মূলত এই দুই জটিল রোগের প্রধান ও বিপজ্জনক কারণ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি যদি নিজের শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ সফলভাবে কমিয়ে ফেলতে পারেন, তবে তা তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা এবং লিভারের স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত ইতিবাচক ও জাদুকরী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট অভিমত অনুসারে, সঠিক নিয়মে ওজন কমালে যেমন লিভারের ভেতর জমে থাকা ক্ষতিকর চর্বি গলতে শুরু করে, তেমনই রোগগুলোর বৃদ্ধির গতিও অনেকাংশে শ্লথ হয়ে আসে।

শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কেবল চামড়ার নিচেই জমা হয় না, বরং তা আমাদের অগ্ন্যাশয়, লিভার এবং পেশির চারপাশের অন্দরেও থিতু হয়। এই জমে থাকা জেদি চর্বিই পরবর্তীতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে তোলে এবং ফ্যাটি লিভারের মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে। তবে যখন কেউ ওজন কমাতে শুরু করেন, তখন শরীর শক্তি উৎপাদনের জন্য সেই জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বিকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে লিভারের ওপর থেকে দ্বিগুণ চাপ কমে যায়, শরীরের অন্দরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হ্রাস পায় এবং রক্তের শুল্ক বা সুগার লেভেল নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

চিকিৎসকদের মতে, ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় লিভারের কোষগুলির অন্দরে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে ফ্যাট জমা হতে থাকে। সময়মতো এর সঠিক চিকিৎসা বা প্রতিকার না করা হলে এই পরিস্থিতি পরবর্তীতে এনএএসএইচ (NASH), লিভার ফাইব্রোসিস এমনকি সিরোসিসের মতো মারাত্মক ও জীবনঘাতী ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে। নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ওজন কমালে লিভারের ভেতরের প্রদাহ দ্রুত হ্রাস পায়, লিভারের মধ্যে জমে থাকা ফ্যাট সাফ হতে থাকে, ফাইব্রোসিস বৃদ্ধির মারাত্মক ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে এবং সামগ্রিকভাবে লিভারের এনজাইমের কার্যকারিতা বহুগুণ উন্নত হয়।

অন্যদিকে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রোগীর শরীর ইনসুলিনের সঠিক ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়। অতিরিক্ত ওজন এবং বিশেষ করে পেটের মেদ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত ওজনে ভোগা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগীরা যদি তাদের শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমাতে পারেন, তবে তাঁদের হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য এবং গ্লাইসেমিক কন্ট্রোল—উভয় ক্ষেত্রেই অবিশ্বাস্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা চমৎকারভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে, ইনসুলিন অনেক বেশি কার্যকরভাবে কাজ করতে শুরু করে, রক্তে এইচবিএওয়ানসি (HbA1c)-এর মাত্রা কমে আসে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের দৈনন্দিন ওষুধের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত স্থূলতা বা পেটের চর্বিযুক্ত মানুষ, মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি, উচ্চ কোলেস্টেরল বা হাই ব্লাডপ্রেশারের রোগী এবং ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় জর্জরিত ব্যক্তিদের এই বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এই সমস্ত জটিল রোগ থেকে মুক্তি পেতে অসম্ভব বা অতিরিক্ত ওজন কমানোর কোনো প্রয়োজন নেই। শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ঝরিয়ে ফেলতে পারলে লিভারে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, লিভারের ফ্যাট গলে যায় এবং সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোনো শর্টকাট না নিয়ে সর্বদা নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদী জীবনধারা পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া উচিত।