লাদাখ সীমান্তে কি বড় স্বস্তি? চিনা ফৌজের উপস্থিতি কমতেই বিরাট দাবি ভারতীয় সেনার!

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি (LAC) সংলগ্ন এলাকাগুলিতে চিনা সেনার উপস্থিতি এবং মোতায়েন আগের তুলনায় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২০২৫-২৬ সালের সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক রিপোর্টে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি প্রকাশ্যে এসেছে। সেনাবাহিনীর তরফে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, সীমান্তে চিনা সেনা বহর কমলেও যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য ভারতীয় জওয়ানরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং পাহারায় কড়া অবস্থান বজায় রেখেছে। দুই দেশের মধ্যে চলা ধারাবাহিক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক স্তরের ইতিবাচক আলোচনার ফলেই যে সীমান্ত অঞ্চলে এই স্থায়িত্ব ও শান্তি ফিরে এসেছে, সে কথাও রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে পূর্ব লাদাখে অনুষ্ঠিত ২৩তম কর্পস কমান্ডার স্তরের বৈঠকের ভূমিকা এই শান্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। পাশাপাশি, সমস্ত সেক্টরেই পারস্পরিক সৌজন্যমূলক পরিবেশে সীমান্ত কর্মী বৈঠক নিয়মিতভাবে অব্যাহত রয়েছে।

তবে শুধুমাত্র চিন সীমান্ত বা লাদাখ নয়, দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং সীমান্ত পারের অন্যান্য বহুমুখী চ্যালেঞ্জ ও অর্জনের বিস্তারিত বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে এই রিপোর্টে। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর অভাবনীয় সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, এই অভিযান দেশের বহুমুখী সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা তথ্যের সঠিক মূল্যায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে সেনা জানিয়েছে যে, উপত্যকার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিংসা এবং বিক্ষোভের ঘটনা অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সবথেকে স্বস্তির বিষয় হলো, গত এক বছরের মধ্যে উপত্যকায় পাথর ছোড়ার একটিও অপ্রীতিকর ঘটনা নথিবদ্ধ হয়নি। সাধারণ মানুষও এখন জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসে বিভিন্ন সরকারি ও সামরিক উন্নয়নমূলক কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সীমান্ত পেরিয়ে মোট ৬টি অনুপ্রবেশের বড়সড় চেষ্টা হয়েছিল, যার জেরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ১২ জন পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদী নিহত হয়েছে। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, স্থানীয় উপত্যকার যুবকদের মধ্যে নতুন করে জঙ্গি সংগঠনে নাম লেখানোর প্রবণতা এক ধাক্কায় একেবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সারা বছরে মাত্র একজন স্থানীয় যুবক জঙ্গি দলে যোগ দিয়েছিল, যা ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সমস্ত ভুয়ো প্রোপাগান্ডা এবং মিথ্যা দাবিকে সম্পূর্ণরূপে নস্যাৎ করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রণরেখায় সার্বিক অনুপ্রবেশের চেষ্টা কিছুটা কমলেও পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা কিন্তু বিগত এক বছরে বেশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০২৪ সালে যেখানে এই ধরনের মাত্র দুটি লঙ্ঘনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৩টিতে। যার মধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ ১২৪টি ঘটনাই ঘটেছিল সংবেদনশীল ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানের সময়ে। পরবর্তীতে দুই দেশের ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস বা ডিজিএমও (DGMO) স্তরে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পরই সীমান্ত পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে আসে।

তাছাড়া, দেশের পশ্চিম সীমান্তে ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানের অনুপ্রবেশ বর্তমানে ভারতীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন ও বড় চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, পঞ্জাব, রাজস্থান এবং জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলি মিলিয়ে মোট ৮৬৩টি ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারতীয় সেনা অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে সর্বাধুনিক অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আকাশে উড়ন্ত মোট ২৩৭টি সন্দেহভাজন ড্রোন সফলভাবে ধ্বংস করেছে। মূলত এই ড্রোনগুলির মাধ্যমে সীমান্ত পার থেকে বিপুল পরিমাণে মাদকদ্রব্য এবং অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের মারণ চক্রান্ত করা হচ্ছিল। ভারতীয় সেনার এই অবিরাম ও কড়া নজরদারির ফলেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি অস্ত্র এবং কোটি কোটি টাকার মাদক বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই সুরক্ষাতেই এই রিপোর্ট এক নতুন নিরাপত্তার বার্তা দিচ্ছে।