টানেলে জল ও ধ্বংসাবশেষের তান্ডব! চামোলিতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত বেড়ে ৭, নিখোঁজদের বাঁচাতে যুদ্ধকালীন তৎপরতা

উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলা থেকে একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক খবর সামনে এসেছে। তেহরি হাইড্রো ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন বা টিএইচডিসি-র বিষ্ণুগড়-পিপলকোটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি নির্মাণাধীন সুড়ঙ্গের ভেতরে আকস্মিক জল এবং ধ্বংসাবশেষ ঢুকে পড়ায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত সাতজন কর্মীর মৃত্যুর মর্মান্তিক সংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, অন্যদিকে ১৯ জন কর্মীকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ঘটনার প্রায় চল্লিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা বাকি তিনজন নিখোঁজ শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের জন্য বর্তমানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে এবং উদ্ধারকাজ তদারকি করতে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পুরো ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের ম্যাজিস্ট্রিয়াল তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

দুর্ঘটনার সময় সুড়ঙ্গটির ভেতরে সর্বমোট ২২ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। উদ্ধারকারী দলগুলির এই মুহূর্তে মূল লক্ষ্য হলো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সুড়ঙ্গের ভেতরের শেষপ্রান্তে পৌঁছে নিখোঁজ তিনজন শ্রমিকের নাগাল পাওয়া। বর্তমানে নিখোঁজ থাকা শ্রমিকদের পরিচয় প্রকাশ্যে এসেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা লুকাস টপনো এবং ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা চেতন পোয়াম ও দেবনাথ। উদ্ধারকাজে নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ দল ও আধুনিক যন্ত্রপাতি অবিরাম কাজ করে গেলেও এই বিশাল উদ্ধার অভিযানে তিনটি প্রধান প্রাকৃতিক ও কারিগরি প্রতিবন্ধকতা বাধা সৃষ্টি করছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে ভূমিধসের কারণে প্রচুর পরিমাণে জল জমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ পাম্প মেশিনের সাহায্যে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে সম্পূর্ণ জল নিষ্কাশন না করা পর্যন্ত ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় একটানা বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকাজে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের মতে, এই অবিরাম বৃষ্টির জেরে টানেলের আশপাশের এলাকায় পুনরায় নতুন করে ভূমিধসের প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে যে সুড়ঙ্গটি জল ও কাদা-বর্জ্যে পরিপূর্ণ থাকায় প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে কারিগরি বিশেষজ্ঞরা নির্ধারিত উদ্ধার এলাকার প্রতি বর্গমিটার অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে এবং উদ্ধারকর্মীদের মনোবল বাড়াতে মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি নিজে ব্যক্তিগতভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি শুধু বাইরে থেকেই তদারকি করেননি, বরং সাহসিকতার সঙ্গে সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করে এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, আইটিবিপি এবং রাজ্য পুলিশ বাহিনীর উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সমস্ত প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর তিনি গোপেশ্বরের চামোলি জেলা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন আহত শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী ধামি জানান যে এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা এবং নিখোঁজ তিনজনকে উদ্ধারে সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নামানো হয়েছে।

চামোলির পিপলকোঠিতে ঘটা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি বিগত ২০২৩ সালের নভেম্বরে উত্তরকাশী জেলার সিল্কিয়ারা-বারকোট টানেল বিপর্যয়ের ভয়াবহ স্মৃতিকে আবার নতুন করে উসকে দিয়েছে। সে সময় উত্তরকাশীতে টানেল ধসের পর দীর্ঘ ১৭ দিন ধরে ৪১ জন শ্রমিক সুড়ঙ্গের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, যাঁদের পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। বর্তমান প্রশাসন দাবি করেছে যে চামোলি বিপর্যয়ে উপলব্ধ সমস্ত আধুনিক সম্পদ এবং কারিগরি দক্ষতাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাকি তিন শ্রমিককে উদ্ধার করা হবে।