“টাকাই সব, দলের কোনো দাম নেই!” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠলেন প্রাক্তন বিধায়ক, তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক

ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই রাজ্যের শাসকদলের অন্দরে ফাটল চওড়া হতে শুরু করেছে। একদিকে যেমন কালীঘাট শিবির ও অন্য ১দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির তৈরি হয়েছে, তেমনই এর জেরে খোদ একুশে জুলাইয়ের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল থাকাকালীন সময় থেকেই ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে মহা সমারোহে শহিদ দিবস পালন করে আসছে তৃণমূল কংগ্রেস। একসময়ে ওই মঞ্চে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অদম্য কণ্ঠস্বর শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও কর্মী-সমর্থকরা। অথচ খোদ সেই মমতার হাত থেকেই কি আজ একুশে জুলাইয়ের অবিসংবাদিত উত্তরাধিকার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে? এমন চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন তুলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বাদুড়িয়ার প্রাক্তন বিধায়ক কাজী আব্দুর রহিম। উল্লেখ্য, একসময়ে টিকিট না পাওয়ার জেরে ভোটের আগেই তৃণমূলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে কংগ্রেসে ফিরেছিলেন তিনি। এবার একুশে জুলাই এবং দলের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর এই মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র ঝড় তুলেছে।
এদিন ২১ জুলাইয়ের প্রসঙ্গ টেনে কাজী আব্দুর রহিম সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে বলেন, “মানুষ জীবনে পাপ করলে তার প্রায়শ্চিত্ত করতেই হয়। কংগ্রেসের একসময়ের একুশে জুলাই একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাইজ্যাক করে নিয়েছিলেন। আর আজ ঠিক তেমনই অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকেও সবকিছু হাইজ্যাক হয়ে গেল।” এখানেই শেষ নয়, এই পতনের জন্য দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও চরম ভাষায় কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি।
অভিষেকের বিরুদ্ধে তোপ দেগে প্রাক্তন বিধায়ক দাবি করেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত কর্মকাড়ার ও ভুল সিদ্ধান্তের ফল আজ হাড়ে হাড়ে ভোগ করতে হচ্ছে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহু বছর ধরে রক্তজল করে এবং চূড়ান্ত কষ্ট করে এই রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন। কিন্তু একদিকে দল আর অন্যদিকে তাঁর ভাইপো—এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে ভাইপোর সীমাহীন অত্যাচার, দুর্নীতি এবং তোলাবাজির পরিমাণ এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছেন। দলের বড় বড় নেতা থেকে শুরু করে বহু নির্বাচিত জন প্রতিনিধিরা আজ একে একে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এটিকে নিছক ভাগ্যের পরিহাস বলে ব্যাখ্যা করে তিনি আরও যোগ করেন যে, অভিষেকের কাছে রাজনৈতিক দল বা আদর্শ বলে কিচ্ছু নেই, তাঁর কাছে কেবল ‘টাকাই’ হল সর্বেসর্বা।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনে প্রাক্তন এই বিধায়ক জানান যে, অভিষেকের আসল ও মুখোশহীন রূপ তিনি প্রথম দেখেছিলেন গত ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে। সেই সময় অভিষেক জেলা সফরে বের হওয়ার পর থেকে দলের অন্দরে পুরোপুরি টাকার খেলা শুরু হয়েছিল। টাকার বিনিময়ে টিকিট বিলি করা হয়েছিল এবং যাঁরা মোটা অঙ্কের টাকা দিতে পেরেছিলেন, কেবল তাঁরাই দলীয় টিকিট পেয়েছিলেন। তিনি নিজে সেই সময় টাকা দিতে পারেননি বলেই তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তিনি সেদিনই বুঝতে পেরেছিলেন যে অভিষেকের এমন অন্ধ কার্যকলাপের জেরে শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই একদিন চরম মূল্য চোকাতে হবে। অভিষেকের একমাত্র চাহিদা হল অর্থ, অর্থ এবং অর্থ—এমনই মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
এদিকে, প্রাক্তন বিধায়কের এই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও বিস্ফোরক মন্তব্যের জেরে রাজ্য রাজনীতি যখন উত্তাল, তখন সুযোগ বুঝে শাসক শিবিরকে তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়েনি বিরোধী দল বিজেপি। বসিরহাট জেলা কমিটির সদস্য বিশ্বজিৎ পাল এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে বলেন যে, বর্তমানে বাংলায় আদতে কোনো তৃণমূল দল বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তৃণমূল এখন একটি অদৃশ্য আত্মায় পরিণত হয়েছে এবং আগামী দিনে সেই অদৃশ্য আত্মাকেও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কে কোথায় একুশে জুলাই পালন করছে বা কোন কোন্দল বাঁধছে, তা নিয়ে বিজেপির মাথা ব্যথা নেই, কারণ সাধারণ মানুষের পাশে থেকে প্রকৃত উন্নয়নমূলক কাজ করাই হল বিজেপির একমাত্র মূল উদ্দেশ্য।