চলন্ত বাইকে গলায় বসল চিনা মাঞ্জার ফাঁদ! স্বাধীনতা দিবসের দিন মর্মান্তিক মৃত্যু ডেলিভারি এজেন্টের

স্বাধীনতা দিবসের খুশির আমেজের মাঝেই দিল্লির রাজপথ রক্তে ভেসে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। চিনা মাঞ্জার (সিন্থেটিক ঘুড়ির সুতো) মারণ ফাঁদে পড়ে চলন্ত বাইকের উপর গলা কেটে করুণ মৃত্যু হয়েছে এক ২৫ বছর বয়সি তরুণ অনলাইন ডেলিভারি এজেন্টের। নিহত এই যুবকের নাম রবি রাজ। তিনি মূলত বিহারের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও কর্মসূত্রে বর্তমানে নয়ডাতেই বসবাস করতেন এবং অনলাইন ডেলিভারির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পুলিশ প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতা দিবসের উৎসবমুখর আবহে শনিবার দুপুর ঠিক দুটো নাগাদ রবি রাজ তাঁর বন্ধু নরেশকে বাইকের পেছনে বসিয়ে নয়ডা থেকে দিল্লির গাজীপুরের দিকে রওনা হয়েছিলেন। সেই সময় দিল্লি-মেরঠ এক্সপ্রেসওয়ে (DME) ধরে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে চলা তাঁদের বাইকটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটারেরও বেশি।
ঘটনাটি যেভাবে ভয়াবহ রূপ নেয়, তা এককথায় লোমহর্ষক। ইউপি গেটের ঠিক কাছে একটি স্বনামধন্য মিডিয়া হাউসের সামনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ বাতাসে উড়ে আসা একটি ঝুলন্ত চায়নিজ মাঞ্জা সরাসরি রবিরাজের গলায় এসে পেঁচিয়ে যায়। বাইকের প্রচণ্ড গতি এবং সুতোর তীব্র ধারালো স্বভাবের কারণে মুহূর্তের মধ্যে সেই সিন্থেটিক সুতো তাঁর গলার চামড়া ভেদ করে গভীরে ঢুকে যায়। সুতো গলায় বসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রবি রাজ বাইকের উপর থেকে নিজের শারীরিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইকের পিছনে বসে থাকা তাঁর বন্ধু নরেশ চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং চলন্ত বাইকের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে কোনোমতে মোটরবাইকটিকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করান। কিন্তু ততক্ষণে রবিরাজের গলা কেটে প্রচুর পরিমাণে রক্তপাত শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় উপস্থিত শত শত পথচারী ও স্থানীয় মানুষ এগিয়ে এসে তাঁর গলায় কাপড় পেঁচিয়ে রক্তপাত বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। খবর পাওয়া মাত্রই কৌশাম্বি থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহায়তায় গুরুতর জখম রবিরাজকে দ্রুত উদ্ধার করে বৈশালীর ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি; হাসপাতালে চিকিৎসকরা তাঁকে পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর পথচারীদের উদ্ধারকাজের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়, যেখানে বন্ধু নরেশকে হাউহাউ করে কাঁদতে এবং কোনোমতে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। পুলিশ এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা রুজু করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেছে।
আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে চলছে এই অবৈধ ব্যবসা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও নিষিদ্ধ চিনা মাঞ্জার অবাধ ও বেআইনি কেনাবেচা ও ব্যবহার নিয়ে জনমনে মারাত্মক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ্য, চিনা মাঞ্জা আসলে একটি নাইলন বা শক্তিশালী সিন্থেটিক সুতো, যা কাচ গুঁড়ো এবং ধারালো কেমিক্যালের প্রলেপ দিয়ে অত্যন্ত বিপদজনকভাবে তৈরি করা হয়। এটি সাধারণ সুতির সুতোর চেয়ে বহু গুণে বেশি ধারালো, শক্ত এবং সহজে ছেঁড়ে না। পরিবেশ ও জীবনের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই চিনা মাঞ্জার উৎপাদন, মজুত, বিক্রি এবং ব্যবহারের উপর সম্পূর্ণ আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক জরিমানার কঠোর বিধান রয়েছে।
প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও, বিশেষ করে স্বাধীনতা দিবসের মতো উৎসবের মরসুমে এই প্রাণঘাতী সুতো চোরাপথে দেদার বিক্রি হয়। সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে ঘাজিয়াবাদ পুলিশ চিনা মাঞ্জা বিক্রির অপরাধে অন্তত ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে একাধিক চক্রের আস্তানা থেকে কয়েকশো বান্ডিল অবৈধ মাঞ্জা বাজেয়াপ্ত করেছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মারাত্মক ধারালো সুতো কেবল দ্রুতগামী বাইক চালকদের জন্যই নয়, বরং পথচারী এবং আকাশে উড়ে বেড়ানো নিরীহ পাখিদের জীবনের জন্যও সমানভাবে বিভীষিকাময় ও মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে।