শ্রাবণ মাসে সাপেদের দুধ খাওয়ানো কি ভক্তি না মৃত্যু পরোয়ানা? ভাইরাল সচক্ষে জানুন আসল সত্যি!

শ্রাবণ মাস এলেই দেশজুড়ে মন্দির থেকে শুরু করে রাজপথ— সর্বত্রই সাপকে দুধ খাওয়ানোর এক অদ্ভুত ধুম পড়ে যায়। হিন্দু সনাতন ধর্মে নাগ পঞ্চমীর দিনে বা শ্রাবণ মাসে শিবপুজোর অঙ্গ হিসেবে সাপকে দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত ভক্তি ও পরম পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞান এবং বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের কঠোর বাস্তবসম্মত তথ্য শুনলে আপনার পিলে চমকে উঠবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যা স্পষ্ট ভাষায় জানাচ্ছে যে, সাপকে দুধ খাওয়ানো কোনো পুণ্য বা সেবা নয়, বরং এটি একটি অবলা প্রাণীর ওপর চরম শারীরিক নির্যাতন এবং ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এক অপরাধমূলক প্রক্রিয়া।
বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচার করলে দেখা যায়, সাপ একটি শীতল রক্তবিশিষ্ট সরীসৃপ প্রাণী, যা সম্পূর্ণভাবে মাংসাশী প্রকৃতির হয়ে থাকে। সাপের শরীরী গঠন এবং পাচনতন্ত্র বা ডাইজেস্টিভ সিস্টেমে দুগ্ধজাত শর্করা অর্থাৎ ল্যাকটোজ (Lactose) হজম করার মতো কোনো প্রয়োজনীয় এনজাইম বা উৎসেচক থাকে না। প্রকৃতির নিয়মে সাপ কখনওই নিজের ইচ্ছায় বা প্রকৃতিতে দুধ পান করে না; বরং ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি বা ছোট পাখি শিকার করে খেয়েই তারা তাদের জীবনধারণ করে থাকে। তাহলে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, পুজোর দিনগুলোতে মন্দিরে বা সাপুড়েদের সামনে পাত্র থেকে সাপ কেন গলার নিচে দুধ ঢালে?
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের গবেষণা ও অনুসন্ধানে এই রহস্যের এক অত্যন্ত নির্মম ও ভয়ংকর সত্য সামনে এসেছে। উৎসবের মরশুম আসার অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন আগে জঙ্গল বা বন্য পরিবেশ থেকে বন্য সাপ ধরে এনে সেগুলির ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। প্রথমে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সাপগুলির বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া হয় এবং বিষগ্রন্থি সম্পূর্ণভাবে উপড়ে ফেলা হয়। এরপর টানা এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন ধরে ওই অসহায় প্রাণীগুলোকে কোনো ধরনের খাবার বা এক ফোঁটা জলও দেওয়া হয় না। দিনের পর দিন তীব্র নির্জলতায় সাপের শরীর যখন মারাত্মকভাবে ডিহাইড্রেটেড বা জলশূন্য হয়ে পড়ে এবং তারা মৃত্যুর ঠিক মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়, ঠিক সেই মুহূর্তে অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের সামনে তরল হিসেবে বাটি ভর্তি দুধ ধরা হয়। তীব্র তৃষ্ণা মেটাতে এবং বাঁচার অন্তিম তাগিদেই সাপ বাধ্য হয়ে ওই তরল পান করতে বাধ্য হয়।
তৃষ্ণার্ত অবস্থায় জোর করে দুধ পানের পরিণতি ওই অবলা জীবের জন্য অত্যন্ত করুণ ও ভয়ানক হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু সাপের শরীর ল্যাকটোজ হজম করতে পারে না, তাই এই কৃত্রিম খাদ্য গ্রহণের ফলে তাদের পেটে মারাত্মক সংক্রমণ, পরিপাকতন্ত্রের ব্যাধি এবং তীব্র অ্যালার্জি দেখা দেয়। অনেক সময় জোর করে দুধ খাওয়ানোর সময় তা সাপের শ্বাসনালী ও ফুসফুসে ঢুকে পড়ে, যার ফলে অবধারিতভাবে মারাত্মক নিউমোনিয়া হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই করুণ মৃত্যু ঘটে ওই সরীসৃপটির। তাই পুণ্য অর্জনের এই অন্ধ বিশ্বাস ত্যাগ করে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।