“ঘরছাড়া হবেন লক্ষ লক্ষ মানুষ!”-সমুদ্রের জলস্তর নিয়ে বিস্ফোরক দাবি UN-এর

যান্ত্রিক সভ্যতার যথেচ্ছ বিস্তার এবং পরিবেশের ওপর নির্বিচারে আঘাত হানার ভয়াবহ পরিণতির সাক্ষী এখন গোটা বিশ্ব। সম্প্রতি নেপালের ভয়াবহ বন্যায় যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১১০০ মানুষ, ঠিক তখনই বিশ্বের ভবিষ্যত নিয়ে আরও এক আতঙ্কজনক তথ্য সামনে এনেছে রাষ্ট্রসংঘ। সোমবার প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সমুদ্রের জলস্তর আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সরাসরি ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে ভারতের দুই প্রধান মহানগর—কলকাতা এবং মুম্বই।
ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বিপদ এখন দরজায় কড়া নাড়ছে
রাষ্ট্রসংঘের ওই রিপোর্টে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা উপকূলীয় এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ার ঘটনাটি আর কোনও দূর ভবিষ্যতের কাল্পনিক হুমকি নয়, বরং এটি বর্তমানের এক নির্মম বাস্তব। অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণে বাড়ছে সমুদ্রের জলস্তর। যার সরাসরি প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে শহুরে পরিকাঠামো, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং ভূগর্ভস্থ জলের সম্পদের ওপর।
ঝুঁকির ধরন আলাদা উন্নত দেশ আর উন্নয়নশীল দেশের জন্য
রিপোর্টে বলা হয়েছে, জলস্তর বৃদ্ধির এই সংকট বিশ্বজুড়ে সব জায়গায় সমানভাবে আঘাত হানছে না। আমেরিকার মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক কিংবা চিনের গুয়াংঝৌর মতো উন্নত শহরগুলিতে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ার ফলে মূলত কোটি কোটি ডলারের সম্পত্তি ও উপকূলীয় পরিকাঠামো ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই দেশগুলিতে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, ভারতের কলকাতা, মুম্বই এবং বাংলাদেশের ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলিতে এই বিপদের মূল বলি হতে চলেছে সাধারণ মানুষ। জলস্তর বৃদ্ধির জেরে উপকূলীয় এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষকে চিরতরে ঘরবাড়ি হারাতে হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
নোনা জলের গ্রাসে নষ্ট হচ্ছে পানীয় জল ও কৃষি
সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে মিষ্টি জল এবং নোনা জলের সংযোগস্থল ক্রমশ স্থলভাগের ভিতরের দিকে প্রবেশ করছে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলিতে লবণাক্ততা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামুদ্রিক জল স্থলভাগে ঢুকে পড়ায় দীর্ঘস্থায়ী দূষণ ছড়াচ্ছে ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ জলে, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যকে বিপন্ন করে তুলছে। এর পাশাপাশি তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে পানীয় জলের নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং সেচ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও।
কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?
রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টে এই দ্রুত জলস্তর বৃদ্ধির স্পষ্ট কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে হু হু করে গলে চলেছে হিমবাহ। পাশাপাশি, উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাসাগরের তাপীয় প্রসারণের ফলে বাড়ছে জলের আয়তন। তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর গড়ে ৪.৭ মিলিমিটার করে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই এই বৃদ্ধির পরিমাণ এক লাফে ৫.৯ মিলিমিটারে গিয়ে ঠেকেছে, যা এক বছরে সর্বোচ্চ জলস্তর বৃদ্ধির রেকর্ড। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লাগামছাড়া পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কলকাতা ও মুম্বইয়ের মতো জনবহুল উপকূলীয় শহরগুলির ভবিষ্যৎ চরম অন্ধকারের দিকে এগোবে।