খাস কলকাতায় পানীয় জলে মরা মাছ! বোতলে জল ভরতেই আঁতকে উঠলেন শিক্ষক, পুরসভায় তোলপাড়

খাস মধ্য কলকাতার বুক চিরে চলা পানীয় জলের পাইপলাইন থেকে মরা মাছের মতো বস্তু এবং তীব্র ময়লা বের হওয়ার ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কলকাতার মতো একটি মেট্রোপলিটন শহরে বাড়ি বাড়ি পরিশ্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার সরকারি দাবিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পার্সিবাগান এলাকায়। বোতলে জল ভরতে গিয়ে এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে রীতিমতো চমকে ওঠেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহিদুল আনসার। এই ঘটনার পর থেকে তাঁর পরিবারসহ সমগ্র এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাধারণত কলকাতার উত্তর, মধ্য কিংবা দক্ষিণের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পুরসভার পক্ষ থেকে বাড়ি বাড়ি যে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ করা হয়, তার গুণমান নিয়মিত বিভিন্ন পরীক্ষাগারে যাচাই করা হয় বলেই দাবি প্রশাসনের। নাগরিকদের দোরগোড়ায় সেই জল পৌঁছানোর আগে তার বিশুদ্ধতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। অথচ, সম্প্রতি পার্সিবাগান এলাকার ওই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বাড়িতে সরবরাহ করা জলের কল খুলতেই যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা সমস্ত পূর্বনির্ধারিত নিরাপত্তাদাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জলের পাইপলাইনের ভিতর থেকে মাছের মতো কিছু জিনিস এবং কাদা-ময়লা মিশ্রিত জল বেরিয়ে আসতে দেখে হতবাক হয়ে যান তিনি। সঙ্গে সঙ্গে সেই দূষিত জলের নমুনা একটি বোতলে বন্দি করে রাখেন ওই শিক্ষক।
দূষিত ও পচা জলের নমুনা হাতে পাওয়ার পরই গভীর আশঙ্কায় দিন কাটতে শুরু করে ওই শিক্ষকের পরিবারের। এই জল পান করা তো দূরের কথা, দৈনন্দিন রান্নাবান্না বা হাত-মুখ ধোওয়ার কাজেও ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অথচ বিকল্প কোনও জল সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশায় কলকাতা পুরনিগমের দ্বারস্থ হন শহিদুল আনসার। পুরসভার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তিনি একটি লিখিত অভিযোগপত্রও জমা দেন। তবে অভিযোগ জানাতে গিয়ে তাঁকে চরম প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ।
তাঁর অভিযোগ, তাঁর লেখা চিঠিতে সামান্য কিছু বানান বা ভাষাগত ভুল থাকার অজুহাত দেখিয়ে তাঁকে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে বাধ্য করা হয়। পানীয় জলের মতো একটি অতিসংবেদনশীল ও জীবনদায়ী বিষয়ে জলের গুণমান বা দূষণের মতো গুরুতর অভিযোগটি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়। আধিকারিকদের কাছে চিঠির সামান্য কিছু ভুলত্রুটিই প্রধান হয়ে ওঠে, অথচ জলবাহিত রোগের আশঙ্কার বিষয়টি পুরোপুরি গুরুত্বহীন থেকে যায়। দিনের পর দিন বিভিন্ন পুরকর্তার দপ্তরে ঘুরেও কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। শেষমেষ কলকাতার প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডের দপ্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন তিনি। যদিও প্রশাসকের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সাক্ষাৎ না হলেও তিনি স্মিতা পাণ্ডের দপ্তরে গিয়ে লিখিত অভিযোগপত্রটি জমা দিয়ে আসেন।
অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর কয়েকদিন অতিক্রান্ত হলেও এখনও পর্যন্ত পুরসভার পক্ষ থেকে কেউ তাঁর বাড়িতে এসে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেননি। জল সরবরাহ বিভাগের কোনো আধিকারিক বা কর্মীরা পার্সিবাগান এলাকায় এসে পাইপলাইনে কোনও ফাটল বা ত্রুটি রয়েছে কিনা, তা যাচাই করতে আসেননি। ফলে আজও সমস্যার কোনো সুরাহা হয়নি। শহরের পানীয় জলের লাইনে এ ধরনের ময়লা ও মরা মাছের মতো বস্তু আসার অর্থ জলের সঙ্গে রোগজীবাণু বা বিষাক্ত পদার্থ মিশে যাওয়ার আশঙ্কা। এর ফলে পার্সিবাগান ও সংলগ্ন এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু, কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের আতঙ্ক গ্রাস করেছে। দ্রুত পুরনিগম এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে পাইপলাইনের ত্রুটি সংশোধন না করলে বড় ধরণের স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।