প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ! কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ফের বৃহত্তর ছাত্র আন্দোলনের হুংকার যন্তর মন্তরে

রাজধানী দিল্লির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে ফের একবার চরম উত্তেজনা ও আশঙ্কার মেঘ ঘনাতে শুরু করেছে। ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট (NEET) প্রশ্নফাঁস কাণ্ডের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি (CJP) ফের একবার সরকারের বিরুদ্ধে হুংকার ছেড়েছে। কেন্দ্রের তরফে আন্দোলনকারীদের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাস্তবে তা রক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছে এই ছাত্র সংগঠন। আর এই বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তুলেই বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পুরোপুরি বদলে গিয়েছে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরের (Delhi Jantar Mantar) চিরচেনা চিত্র। গোটা এলাকা জুড়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী, আধা সামরিক শক্তির উপস্থিতি এবং লোহার ব্যারিকেড ওয়েল্ডিং করে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে গোটা চত্বরটি।

প্রসঙ্গত, নিট প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে একটানা ৩৬ দিন ধরে তীব্র আন্দোলন চালিয়েছিল সিজেপি। অবশেষে গত ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাসের ওপর ভরসা রেখেই তারা সাময়িকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সংগঠনের মূল দাবি ছিল, সরকারের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী আন্দোলনকারী কোনো ছাত্র বা সংগঠনের সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ বা পুলিশি হয়রানি করা হবে না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে। সিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দাবি, কেন্দ্র সরকার তাদের সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ইতিমধ্যেই বহু আন্দোলনকারী ছাত্রকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন করে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে।

সংগঠনের জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করেছেন যে, অবিলম্বে সমস্ত ভুয়া এফআইআর (FIR) প্রত্যাহার করতে হবে, কারাবন্দি সমস্ত ছাত্রকে নিঃশর্তে মুক্তি দিতে হবে এবং গত ২৫ জুলাই সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যে লিখিত বা মৌখিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ্যে আনতে হবে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে আন্দোলন স্থগিত করে নিজের শহর মহারাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকার তাঁদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে আবারও জোর করে রাজপথে নামাতে বাধ্য করছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ছাত্রসমাজের মনে যে গভীর ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে, তা কেবল কোনো একজন মন্ত্রীর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে।

পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় এবং কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো যায়, তার জন্য দিল্লি পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন থেকেই কঠোর তৎপরতা শুরু করেছে। যন্তর মন্তর চত্বরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনকারীরা যাতে নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে কোনো বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে না পারেন, তার জন্য রাস্তার দুই ধারের বিশালাকার ধাতব ব্যারিকেডগুলিকে একে অপরের সঙ্গে মজবুত লোহা দিয়ে ওয়েল্ডিং করে জোড়া লাগানো হচ্ছে। যাতে কোনোভাবেই নিরাপত্তা বলয় ভেদ করা সম্ভব না হয়।

এদিকে, কেবল রাজপথের আন্দোলনই নয়, আইনি লড়াইয়ের ময়িদাটেও সমানভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সিজেপি। সরকারের তরফ থেকে মিথ্যা মামলা ও আইনি ফাঁদে ফেঁসে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তা প্রদান করতে ‘SAAKSHI’ নামের একটি অত্যাধুনিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং দেশব্যাপী একটি বিশেষ লিগ্যাল এইড সেল চালু করা হয়েছে। এই আইনি লড়াইকে আরও শক্তিশালী করতে বিশিষ্ট আইনজীবী তথা রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিব্বল ব্যক্তিগতভাবে ১ কোটি টাকার একটি বিশেষ ফান্ড বা তহবিল দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। সবমিলিয়ে, দিল্লির যন্তর মন্তরের বর্তমান পরিবেশ অত্যন্ত থমথমে ও অগ্নিগর্ভ। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় সরকার এই ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে দ্রুত কোনো অর্থবহ বৈঠকে বসে সংকট সমাধান করে, নাকি রাজধানী শহর ফের একবার এক ঐতিহাসিক ও ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের সাক্ষী থাকে।