উদ্যান থেকে ১৩টি ময়ূর ও বহু পাখি উধাও! বারুইপুরে গ্রেফতার পুরসভার সুপারভাইজার, নেপথ্যে কি বড় পাচারচক্র?

কলকাতা থেকে মাত্র ৩১ কিলোমিটার দূরে বারুইপুরের আদি গঙ্গার তীরে অবস্থিত ‘আরণ্যক বনভোজন উদ্যান’ থেকে ১৩টি ময়ূরসহ একাধিক দেশি-বিদেশি পাখি ও প্রাণী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। উদ্যানের ভেতর একাধিক পাখির মৃত্যুর অভিযোগ এবং বহু প্রাণী উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় বারুইপুর থানার পুলিশ উদ্যানের সুপারভাইজার তথা বারুইপুর পুরসভার সাফাই বিভাগের সুপারভাইজার পল্লব ভারতীকে গ্রেফতার করেছে। বুধবার দুপুরে প্রথমে তাঁকে আটক করা হয় এবং দীর্ঘ জল্পনা ও ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পাশাপাশি, বন দফতরের পক্ষ থেকেও তাঁকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং থানায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

জানা গিয়েছে, বারুইপুরের আদি গঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ওই উদ্যানে ময়ূরের পাশাপাশি কচ্ছপ, টিয়া এবং অন্যান্য বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতির বন্যপ্রাণী রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সরেজমিন তদন্তে দেখা গিয়েছে যে, ওই বাগানে একটিও ময়ূর অবশিষ্ট নেই। স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিযোগকারীদের জোরালো দাবি, ময়ূর ছাড়াও উদ্যান থেকে কচ্ছপ ও অন্যান্য বহু দুর্লভ পাখি সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং সম্ভবত সেগুলিকে গোপনে অবৈধভাবে বিক্রি বা পাচার করে দেওয়া হয়েছে।

বুধবার গভীর রাতে গ্রেফতার হওয়া সুপারভাইজার পল্লব ভারতীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর বৈষ্ণবপাড়ার তিনতলা প্রাসাদোপম বাড়িতে একযোগে তল্লাশি অভিযান চালায় বারুইপুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। এই হাইভোল্টেজ তল্লাশি অভিযানকে কেন্দ্র করে ওই বাড়ির সামনে স্থানীয় মানুষের প্রচণ্ড ভিড় জমে যায়। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ও নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকায় প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জানা গেছে, তল্লাশির সময় অভিযুক্তের স্ত্রী ও ছেলেও বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সূত্রে খবর, সুপারভাইজারের ওই বাড়ির প্রায় প্রতিটি ঘরে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালানো হয়। বাড়ির ঠিক বাইরে থেকে বেশ কিছু ময়ূরের পালক উদ্ধার করেছেন তদন্তকারীরা। এছাড়া সেখান থেকে আফ্রিকান টিয়া ও কাকাতুয়া জাতীয় বেশ কিছু বিদেশি পাখিরও হদিশ মিলেছে। পাশাপাশি, ঘরের ভেতর থেকে একটি গোপন বাক্সের মধ্য থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং কয়েকটি চেকবই উদ্ধার করে পুলিশ, যা তদন্তের স্বার্থে সঙ্গে সঙ্গেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ওই সমস্ত নথিপত্র ও চেকবইয়ের সঙ্গে আরণ্যক বনভোজন উদ্যানের কোনো আর্থিক লেনদেন বা পাখি কেনাবেচার কোনো অবৈধ যোগ রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। শুধু বৈষ্ণবপাড়ার বাড়িই নয়, পল্লব ভারতীর সঙ্গে যুক্ত আরও একটি সন্দেহজনক জায়গায় অভিযান চালায় পুলিশ। আদিগঙ্গার তীরে ওই উদ্যান লাগোয়া তাঁর ‘চায়ে ক্যাফে’ নামের রেস্তোরাঁতেও হানা দিয়ে বেশ কিছু রেজিস্টার ও হিসাবের খাতা বাজেয়াপ্ত করা হয়। ওই রেস্তোরাঁয় কারা আসতেন, তাঁদের সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড রয়েছে কি না, কিংবা পাখি কেনাবেচা বা পাচার সংক্রান্ত কোনো গোপনীয় তথ্য সেখানে নথিভুক্ত আছে কি না, তা রেজিস্টারগুলি খুঁটিয়ে দেখে যাচাই করা হচ্ছে। এরপর পল্লবকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর ঢাকুরিয়ার একটি ফ্ল্যাটেও তল্লাশি চালান তদন্তকারীরা।

এদিকে, উদ্যানের এক কর্মী গোপাল সর্দার মৃত ময়ূর প্রসঙ্গে বিস্ফোরক দাবি করে বলেন, “দশটা ময়ূর মারা গিয়েছিলো। নিয়মমতো খাবার দিয়ে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু সকালে এসে দেখি সব মরে পড়ে আছে। একদিন চারটে, আবার একদিন দুটো করে ময়ূর মারা যায়।” তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে মৃত ময়ূরের সঠিক সংখ্যা নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, উদ্যানের খাঁচাগগুলি ফাঁকা পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় এক বিজেপি নেতা বারুইপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। যার ভিত্তিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাসের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল তদন্ত শুরু করে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে আটক করে। ধৃতদের মধ্যে একজন দাবি করেছিল যে, একটি ময়ূর মারা যাওয়ার পর সেটিকে উদ্যানের ভেতরেই মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অতীশ বিশ্বাস জানান, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে তিনজনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের জেরা করার পর এবং একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে ইতিমধ্যেই একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে।” তবে পুলিশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জাতীয় পাখি ময়ূরের মৃত্যুর খবর কেন সঙ্গে সঙ্গে বন দফতরকে জানানো হলো না এবং কেন বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের কোনো নিয়ম মানা হলো না? পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই নিখোঁজ ও পাচারকাণ্ডের নেপথ্যে বন্যপ্রাণী পাচারকারী কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের হাত থাকতে পারে।

অন্যদিকে, বারুইপুর পশ্চিম ১ নম্বর মণ্ডল বিজেপির সভাপতি গৌতম চক্রবর্তী এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বলেন, “তৃণমূল দলটাই পশু চোর। একটা সুসংগঠিত বেআইনি পশুর কারবার চলছে। কাউন্সিলররাই এগুলো চালাত। উদ্যানে মোট ১৩টি ময়ূর ছিল, যা রাতারাতি গায়েব হয়ে গিয়েছে। এখন পুরসভা সাফাই দিচ্ছে যে বাজ পড়ে ময়ূরগুলো মারা গিয়েছে!”

বর্তমানে তদন্তকারীদের প্রধান ফোকাস রয়েছে আরণ্যক বনভোজন উদ্যানে থাকা প্রাণীদের প্রকৃত সংখ্যা, তাদের রক্ষণাবেক্ষণের বৈধ নথি এবং নিখোঁজ পাখিগুলির বর্তমান গতিপথের দিকে। ১৩টি ময়ূরসহ যে পাখিগুলির এখনও কোনো হদিশ মেলেনি, সেগুলি ঠিক কোথায় গেল, আদৌ কোনো পাখি বিক্রি করা হয়েছিল কি না, নাকি অন্য কোথাও পাচার করা হয়েছে—তা স্পষ্ট করতে মরিয়া তদন্তকারীরা।