ক্যান্সার চিকিৎসায় ঐতিহাসিক যুগান্তকারী সাফল্য! মেডার্না ও মার্কের এমআরএনএ ভ্যাকসিনে কমল মারণ রোগের ঝুঁকি

ক্যান্সার চিকিৎসায় এক নতুন বৈপ্লবিক দিগন্ত উন্মোচন করে বিশ্বজুড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছে দুই শীর্ষ বায়োটেক ও ফার্মা জায়ান্ট—মেডার্না এবং মার্ক। ত্বকের অত্যন্ত মারাত্মক ও বিপজ্জনক রূপ ‘মেলানোমা’ বা চর্মরোগের ক্যান্সার রোগীদের জন্য যৌথভাবে উদ্ভাবিত তাঁদের এই পার্সোনালাইজড বা ব্যক্তিগতকৃত ‘এমআরএনএ’ (mRNA) ক্যান্সার ভ্যাকসিন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব সাফল্য এনে দিয়েছে। ল্যাবরেটরির কঠোর এবং চূড়ান্ত ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এটি সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শরীরে এই বিশেষ ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে তা ক্যান্সারের পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা প্রায় ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত সফলভাবে কমিয়ে দিতে পারে।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় জীবনদায়ী প্রতিষেধক তৈরিতে ব্যবহৃত এমআরএনএ প্রযুক্তিকেই গবেষকরা এবার এই মারণ রোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। প্রচলিত ভ্যাকসিনের মতো এটি সাধারণ রোগ প্রতিরোধ করে না, বরং প্রতিটি রোগীর নিজস্ব টিউমারের সুনির্দিষ্ট জেনেটিক বৈশিষ্ট্য বা মিউটেশন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে তৈরি করা হয়। শরীরের কোনও নির্দিষ্ট স্থান থেকে অস্ত্রোপচার করে টিউমার বাদ দেওয়ার পর, এই ভ্যাকসিনটি রোগীর নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সেই মিউট্যান্ট ক্যান্সার কোষগুলোকে নিখুঁতভাবে চিনতে এবং ধ্বংস করতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেয়। এর সাথে মার্ক কোম্পানির বিখ্যাত ইমিউনোথেরাপি ওষুধ ‘কাইট্রুডা’-এর মিশ্রণ রোগীদের এক অনন্য এবং অতিরিক্ত সুরক্ষা প্রদান করে।

হাই-রিস্ক স্টেজ টু-বি থেকে স্টেজ ফোর পর্যন্ত মোট ১,১৩৭ জন মেলানোমা আক্রান্ত রোগীর ওপর এই ফেজ-থ্রি ট্রায়াল চালানো হয়েছিল। ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীদের একদলকে শুধু প্রচলিত কাইট্রুডা এবং অন্য দলকে কাইট্রুডার সাথে নতুন এমআরএনএ ভ্যাকসিনের বিশেষ মিশ্রণ দেওয়া হয়। পরীক্ষার চমকপ্রদ ফলাফলে দেখা গেছে, এই যৌথ চিকিৎসা কেবল ক্যান্সারের পুনরাবৃত্তি রুখে দিয়েছে তা-ই নয়, বরং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার বা মেটাস্ট্যাসিসের মারাত্মক ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। মেলানোমা হল সবচেয়ে আক্রমণাত্মক চর্মক্যান্সার, যা একবার শরীরে ছড়ালে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অস্ত্রোপচারের পর এই ভ্যাকসিন কার্যকর হলে তা ইমিউন সিস্টেমকে সার্বক্ষণিক প্রহরী হিসেবে গড়ে তোলে। গবেষকদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চূড়ান্ত সবুজ সংকেত মেলে, তবে আগামী বছরের মধ্যেই বিশ্ববাজারে নিয়মিত চিকিৎসার অংশ হিসেবে মিলতে পারে এই প্রতিষেধক।

মেডার্না ও মার্ক-এর এই যুগান্তকারী সাফল্য কেবল ত্বকের ক্যান্সারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই ফুসফুস, স্তন এবং অগ্ন্যাশয়ের মতো জটিল অঙ্গের ক্যান্সারের চিকিৎসায় একইভাবে পার্সোনালাইজড এমআরএনএ প্রতিষেধক তৈরির গবেষণা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চালিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস বলছে, নির্দিষ্ট রোগীর ডিএনএ স্ট্রাকচারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ধরনের সুনির্দিষ্ট ওষুধ বা ‘প্রিসিশন অনকোলজি’ ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ম্যালিগন্যান্ট ক্যান্সার মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠতে চলেছে।