“এখনো প্লেন দেখলে ভয় লাগে!” মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পর শিশুদের কান্নায় ভারী বার্ন ইন্সটিটিউট!

গত বছরের ২১শে জুলাই ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ভয়াবহ ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় স্কুলটির ২৮ জন শিশুসহ মোট ৩৬ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার একটি বছর কেটে গেলেও সেই ভয়াবহতার ক্ষত আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে আহত শিশু ও নিহতদের পরিবারগুলিকে। দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত এক স্মরণসভায় উঠে এল সেই করুণ অভিজ্ঞতার চিত্র। এদিনের এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট জুবাইদা রহমান।
স্মরণসভায় উপস্থিত থেকে আহত শিশুরা তাদের অবর্ণনীয় মানসিক ও শারীরিক কষ্টের কথা তুলে ধরে। মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন জাতীয় বার্ন ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন থাকা ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র নুরে জান্নাত ইউশা বিবিসি বাংলাকে তার আতঙ্কের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “এখনো স্কুলে গেলে প্লেন দেখলে ভয় লাগে। রাতে ঘুম হয় না। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখি কেউ মনে হয় আমাকে আগুনে ফেলে দিচ্ছে।” ইউশার মতো পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মেহেরীনও জানাল যে, দুর্ঘটনার পর সে আজও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি। ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে তার আর স্কুলেই যাওয়া হয়ে উঠছে না। মেহেরীনের মা আক্ষেপ করে জানান, “আগে একটা জিনিস পড়লে দুই মিনিটে মুখস্থ হয়ে যেত, আর এখন দুই ঘণ্টা ধরেও একটা লাইন মুখস্থ করতে পারি না। একটু রোদ লাগলে পুরো শরীর জ্বলে যায়।” একইভাবে অপর আহত ছাত্র নিলয় জানাল যে, পরবর্তী অস্ত্রোপচার না হওয়া পর্যন্ত সেও স্কুলে যেতে পারছে না। আহত শিশু নুরে জান্নাত ইউশার মা ইয়াসিন আক্তার জানান, তাঁর মেয়ের নাচের শখ থাকলেও আজ সে সারাদিন ভয়ে চিৎকার করে এবং আতঙ্কিত হয়ে বলে ওঠে—”মা, আবার মনে হয় প্লেন পড়বে।”
এদিনের এই স্মরণসভায় সম্প্রতি মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত ‘বিবিসি বাংলা’-র একটি বিশেষ প্রতিবেদন ও ডকুমেন্টারি প্রসঙ্গ জোরালোভাবে উত্থাপন করেন বক্তারা। ওই প্রতিবেদনে বিমানের পাইলটের প্রশিক্ষণের ঘাটতি, তত্ত্বাবধানের অভাব, স্কুলের বিল্ডিং কোড না মানা, অনুমোদনহীন ভবনে ক্লাস পরিচালনা এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি এলাকায় উচ্চতার নিয়ম লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা বহু ভবনের প্রসঙ্গ সামনে এসেছিল। নিহত স্কুল শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরীর স্বামী মনসুর হেলাল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দেখেছি বিবিসি এই ঘটনা নিয়ে একটি বিশেষ ডকুমেন্টারি করেছে। যেখানে ঘটনার দায় কার, তা উঠে এসেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। আমরা চাই ওই রিপোর্টে কী আছে, তার যেন যথাযথ বাস্তবায়ন হয়।” তিনি আরও জানান, যে ভবনটিতে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ৮০০-৯০০ শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একটি দরজা ছিল। যদি একাধিক দরজা থাকত, তবে অনেক প্রাণ বাঁচানো যেত। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী যাতায়াত করে উল্লেখ করে তিনি অবিলম্বে এর একটি স্থায়ী ও আশু প্রশাসনিক সমাধান দাবি করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ভুক্তভোগী পরিবারগুলি সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আহত ও নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানায়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জুবাইদা রহমান বলেন, “মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা সামلিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা যে সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা সমগ্র জাতির জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণার উৎস।” সবমিলিয়ে, এক বছর পরেও মাইলস্টোনের শিশুদের পুড়ে যাওয়া শরীর আর মনের গভীরে জমে থাকা আতঙ্ক এক ভারী ও শোকস্তব্ধ পরিবেশের জন্ম দিয়েছে পুরো অনুষ্ঠানে।