‘এক পরিবার, এক সংযোগ’-নিয়ে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের,রান্নার গ্যাস নিয়ে সরকারের নতুন কড়া নিয়ম

পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার জেরে বিশ্বজুড়ে তীব্র হয়েছে জ্বালানি সংকট। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাজারে, যার ফলে একাধিক দেশে হু হু করে বাড়ছে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম। এই বিশ্বজনীন সংকটের আঁচ থেকে বাদ পড়েনি ভারতও। দেশের বাজারে ইতিমধ্যেই এক সপ্তাহের মধ্যে দু-দু’বার বাড়ানো হয়েছে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম। একই সঙ্গে আমজনতার কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে মহার্ঘ হয়েছে রান্নার গ্যাসও (LPG)।

রেকর্ড ঘাটতির মুখে ভারত: রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য ‘নিক্কেই এশিয়া’-র একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এলপিজি ভোক্তা দেশ ভারত বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪ লক্ষ ব্যারেল গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত এপ্রিল মাসে ভারতে এলপিজি আমদানির পরিমাণ ছিল দৈনিক ৩৭৭,৬২০ ব্যারেল। অথচ, গত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ চালু ছিল, তখন এই আমদানির পরিমাণ ছিল দৈনিক ৮৫১,৮৭০ ব্যারেল। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আমদানি হ্রাস পেয়েছে অর্ধেকেরও বেশি।

‘এক পরিবার, এক সংযোগ’: কেন্দ্রের কড়া নির্দেশ ও ৩ মাসের সময়সীমা যুদ্ধের জেরে তৈরি হওয়া এই নজিরবিহীন সংকট মোকাবিলায় এবার কোমর বেঁধে নামছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের অভ্যন্তরে এলপিজি-র ঘাটতি মেটাতে এবং কালোবাজারি রুখতে চালু করা হয়েছে “এক পরিবার, এক সংযোগ” নিয়ম।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী: যে সমস্ত পরিবারে ইতিমধ্যেই পাইপলাইনের মাধ্যমে রান্নার গ্যাস (PNG) সংযোগ রয়েছে, তাদের গার্হস্থ্য এলপিজি (LPG) সিলিন্ডার সমর্পণ করতে হবে। একই পরিবারে পিএনজি এবং ভর্তুকিযুক্ত এলপিজি সিলিন্ডার—উভয়ই রাখা এখন থেকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে গণ্য হবে। এই নিয়ম কার্যকর করার জন্য উপভোক্তাদের ৩ মাসের সময়সীমা বা ডেডলাইন দেওয়া হয়েছে।

মার্চেই বেড়েছে দাম, মজুত ভাণ্ডারে টান? চলতি বছরের মার্চের শুরুতেই ১৪.২ কেজির সাধারণ ঘরোয়া এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক ধাক্কায় ৬০ টাকা বাড়িয়েছিল সরকার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ মে পর্যন্ত দেশে ৪৫ দিনের রোলিং স্টক এবং ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত ছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য এই মজুত যথেষ্ট নয়।

বিকল্প বাজারের সন্ধান: দূরত্বের কারণে বাড়ছে চিন্তা

ভারত বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এবং এলপিজি আমদানিতে বৈচিত্র্য আনতে ইরান, অস্ট্রেলিয়া, আর্জেন্টিনা ও চিলির মতো দেশগুলি থেকে গ্যাস কেনা শুরু করেছে।

  • নতুন উৎস থেকে আমদানি: এপ্রিল মাসে এই নতুন উৎসগুলি থেকে ভারত দৈনিক ৪৩,০০০ ব্যারেল গ্যাস পেয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল শূন্য। এছাড়া আমেরিকা ও আর্জেন্টিনা মিলিয়ে এপ্রিল মাসে ভারত প্রতিদিন ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ব্যারেল গ্যাস আমদানি করেছে।

  • দূরত্বের বড় চ্যালেঞ্জ: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে ভারতের দূরত্ব কম হলেও, নতুন এই বিকল্প দেশগুলি থেকে সরবরাহ আসতে প্রচুর সময় লাগছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে গ্যাস পৌঁছাতে যেখানে প্রায় ২০ দিন সময় লাগে, সেখানে আর্জেন্টিনা ও আমেরিকা থেকে কার্গো আসতে সময় লাগছে ৩৫ থেকে ৪৫ দিন।

মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই কি দুর্বলতা? উল্লেখ্য, ভারতে এলপিজি-র কোনও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত মজুত ব্যবস্থা (Strategic Reserve) নেই। দেশীয় চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ভারতকে আমদানি করতে হয়। আর এই আমদানিকৃত এলপিজি-র প্রায় ৮০ শতাংশই আসে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE), কাতার, কুয়েত এবং সৌদি আরব থেকে।

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প পথ খুঁজছে ভারত। একদিকে যেমন অন্য দেশ থেকে আমদানির চেষ্টা চলছে, তেমনই দেশের অভ্যন্তরে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের বাজারে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে আগামী দিনে নিয়মকানুন আরও কঠোর করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy