একসঙ্গে ১৫০ বেহালাবাদকের সুর! মঞ্চে কোন কিংবদন্তিদের শ্রদ্ধা জানাল কলকাতা ইয়ুথ এনসেম্বেল?

অমিতাভ ঘোষের সুযোগ্য তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালে মাত্র কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘কলকাতা ইয়ুথ এনসেম্বেল’ (Kolkata Youth Ensemble)। দেখতে দেখতে দীর্ঘ ১১ বছরের পথ পরিক্রমায় ছোট্ট একটি চারাগাছ আজ এক বিশাল মহীরূহে পরিণত হয়েছে। কলকাতার অতি জনপ্রিয় এই স্ট্রিং অর্কেস্ট্রার মূল আকর্ষণ হিসেবে বরাবরই রয়েছে ভায়োলিন বা বেহালা। পশ্চিমবঙ্গ তথা সমগ্র ভারত বর্ষের ভৌগোলিক গণ্ডি পেরিয়ে আজ আন্তর্জাতিক সীমানার বাইরেও এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে বিভিন্ন বয়স এবং নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কলকাতা ইয়ুথ এনসেম্বেল বর্তমানে এমন এক অনন্য অর্কেস্ট্রা, যা মঞ্চে একসাথে প্রায় ১৫০ জন তরুণ শিল্পীকে সুরের জাদুতে এক সুতোয় বেঁধে সঙ্গীতপ্রেমীদের মন জয় করে চলেছে।

সম্প্রতি ‘ওয়েভস অফ ওজন’ শীর্ষক এক বর্ণিল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নিজেদের ১১ বছর পূর্তি উদযাপিত করল এই স্বনামধন্য সংস্থা। শহরের অন্যতম কৃতি বেহালা বাদক অমিতাভ ঘোষের সুযোগ্য পরিচালনায় এই বিশেষ সঙ্গীত সন্ধ্যাটি বিশেষভাবে উৎসর্গ করা হয়েছিল ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির চার অবিসংবাদিত কিংবদন্তি—সত্যজিৎ রায়, বিদুষী অন্নপূর্ণা দেবী, আশা ভোঁসলে ও সলিল চৌধুরীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। এছাড়া বহু বিশ্ববিখ্যাত পাশ্চাত্য সুরকারদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। তাঁদের জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয় কলকাতা ইয়ুথ এনসেম্বেলের পক্ষ থেকে আয়োজিত বিশাল এবং ব্যতিক্রমী ‘ভোকাল সিম্ফনি’র মাধ্যমে। অনুষ্ঠানে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল, ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল এবং আধুনিক বাংলা ও হিন্দি গানের এক অপূর্ব ও অতুলনীয় মেলবন্ধন এক অনির্বচনীয় সুরধ্বনির সৃষ্টি করে। আধুনিক গানের ভাণ্ডার থেকে বিশেষ কিছু চর্চিত গান তুলে নেওয়া হয়, যেগুলি একমাত্র কিংবদন্তি আশা ভোঁসলের কণ্ঠেই এক অনন্য উচ্চতা লাভ করেছিল। সেই সমস্ত বিখ্যাত গানের সুর নিখুঁতভাবে যন্ত্রসঙ্গীতের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা হয় শ্রোতাদের সামনে।

অনুষ্ঠানের শেষার্ধে সঙ্গীত এবং বাদ্যযন্ত্রের মূর্চ্ছনা একত্রিত হয়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে মিশে এক নতুন ও সৃষ্টিশীল সিম্ফনির জন্ম দেয়। এই জাদুকরী সন্ধ্যায় দেড়শো জন তরুণ শিল্পী মঞ্চ ভাগ করে নেন দেশের বহু খ্যাতনামা ও বরেণ্য শিল্পীর সঙ্গে। উপস্থিত প্রতিটি সঙ্গীত অনুরাগীর কাছে কলকাতা ইয়ুথ এনসেম্বেলের এই জমকালো আয়োজন এক অবিস্মরণীয় ও চিরস্মরণীয় সঙ্গীত সন্ধ্যা হয়ে থাকে। অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মাননা ও সংবর্ধনা প্রদান করা হয় বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্তকে। অর্কেস্ট্রার সুমধুর সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করেন জনপ্রিয় শিল্পী ইন্দ্রাণী সেন। তিনি মঞ্চে গেয়ে শোনান ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’ এবং ‘তোমার হলো শুরু’-র মতো জনপ্রিয় গানগুলি। অন্যদিকে, বিশিষ্ট সুরকার ও গায়ক জয় সরকার তাঁরই নিজস্ব সুরারোপিত অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ‘বৃষ্টি পায়ে পায়ে’ পরিবেশন করে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেন। প্রবীণা শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত তাঁর অনুপম গায়কীতে উপস্থিত সকল শ্রোতাকে মুগ্ধ করেন কালজয়ী রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘তবু মনে রেখো’ পরিবেশন করে। গোটা অনুষ্ঠানটির অত্যন্ত সাবলীল ও আকর্ষক সঞ্চালনা করেন প্রথিতযশা বাচিকশিল্পী সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, যা এই জমকালো সঙ্গীত সন্ধ্যাকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।