‘উত্তমদার ওই দৃশ্য দেখলে আজও কষ্ট হয়!’- মর্মান্তিক স্মৃতি রোমন্থন করলেন দীপঙ্কর দে

কিছু স্মৃতির আনন্দের রেশ যেমন আজীবন থেকে যায়, তেমনই কিছু মুহূর্তের যন্ত্রণা বা মনখারাপ চিরকালের মতো মনে গেঁথে থাকে। কিংবদন্তি পরিচালক তপন সিনহার ক্লাসিক ছবি ‘বাঞ্ছারামের বাগান’-এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তেমনই কিছু দুর্লভ ও আবেগঘন স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি সংশ্লিষ্ট অভিনেতা। উত্তম কুমারকে কেন্দ্র করে কীভাবে বদলে গিয়েছিল এই ছবির কাস্টিং এবং তার নেপথ্যে থাকা অজানা অধ্যায় নিয়েই সম্প্রতি উঠে এসেছে এক মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগপূর্ণ বিবরণ।

উত্তম কুমারের হাতছাড়া হওয়া এবং ছবির পটপরিবর্তন

শুরুতে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ সিনেমার জন্য পরিচালক তপন সিনহার প্রথম এবং একমাত্র পছন্দ ছিলেন খোদ মহানায়ক উত্তম কুমার। কিন্তু হঠাৎই অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল উত্তমদাকে। মজার বিষয় হলো, সেই হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও চিত্রনাট্য পড়া থামাননি তিনি।

পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার পর সূর্যপুরে ছবির জন্য একটি বাগানের সেট তৈরি করা হয়। কিন্তু তখনই বাধে বিপত্তি। উত্তম কুমার শুটিংয়ের দিন কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু সমস্ত প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেই মুহূর্তে শুটিং পিছিয়ে দিলে প্রযোজকের বিরাট আর্থিক ক্ষতি হতো। উপরন্তু, সেট হিসেবে তৈরি করা বাগানটিও শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, যা নতুন করে আর তৈরি করা সম্ভব ছিল না।

পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় তপন সিনহা তাঁর সহকারী পরিচালককে পাঠিয়ে উত্তম কুমারের থেকে চিত্রনাট্য ফেরত আনান। পরিচালক ও প্রযোজকের এই সিদ্ধান্তে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন মহানায়ক। এর পরেই শুরু হয় নতুন মুখের সন্ধান এবং একদিন পরিচালকের অফিস থেকেই ডাক পান বর্তমান অভিনেতা। উত্তম কুমারের জন্য নির্ধারিত সেই চরিত্রে তাঁকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি প্রথমে সংশয়ে পড়েন যে, মহানায়কের করা চরিত্রে তিনি আদৌ সুবিচার করতে পারবেন কিনা। তবে পরিচালক তপন সিনহা তাঁকে সম্পূর্ণ ভরসা জুগিয়ে রিহার্সাল শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সেই চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হন।

উত্তম কুমারের মামলা ও টালিগঞ্জের ক্ষোভ

ছবির শুটিং শুরু হওয়ার পর পরিচালক তপন সিনহার বিরুদ্ধে আইনি মামলা ঠুকে দেন উত্তম কুমার। যদিও আইনি লড়াইয়ে পরবর্তীকালে উত্তমদা হেরে গিয়েছিলেন, তবুও সেই সময়কার পরিবেশ অত্যন্ত থমথমে হয়ে উঠেছিল।

অভিনেতার আক্ষেপ, তিনি বারবার পরিচালককে অনুরোধ করেছিলেন যে উত্তমদার সঙ্গে একবার কথা বলে তাঁর অনুমতি নেওয়া উচিত বা তাঁকে বুঝিয়ে বলা উচিত যে তিনি স্রেফ একজন শিল্পী এবং উত্তমদার বিকল্প কেউ হতে পারেন না। কিন্তু পরিচালক কাউকেই ফোন করতে বারণ করেছিলেন। মানুষটির মনে যে কোথাও একটা গভীর অভিমান জমে ছিল, তা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।

২৪ জুলাই: একরাশ মনখারাপ ও ভবানীপুরের বাড়ি

সময়টা ছিল ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। ওই রাতেই হঠাৎ করে চিরতরে চলে যাওয়ার খবর আসে মহানায়কের। সেই দুঃখের রাতে উত্তম কুমারের ভবানীপুরের বাড়িতে পৌঁছাতে গিয়েও বহুবার ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। কারণ, সেই সময়ে টালিগঞ্জের প্রায় গোটা শিল্পমহলই তাঁর বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল—সবার একটাই প্রশ্ন ছিল, কেন তিনি উত্তম কুমারের ছেড়ে যাওয়া জায়গায় অভিনয় করলেন?

কোনোমতে ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়ে তিনি দেখেন, দুটি বড় বরফের চাঙড়ের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে মহানায়ককে। সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়াতে পারেননি তিনি, একঝলক দেখেই ফিরে এসেছিলেন।

আজও মনের কোণে একটা তীব্র আক্ষেপ রয়ে গেছে যে, একবারও নিজের মনের কথা মহানায়ককে মুখ ফুটে বলতে পারলেন না। আজও অভিনেতার অকপট স্বীকারোক্তি— উত্তম কুমারের মতো এমন অতুলনীয় ও মহান শিল্পী যদি এই ছবিতে অভিনয় করতেন, তবে তা অবশ্যই তাঁর নিজের অভিনয়ের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত ও সমৃদ্ধ হতো।