বাংলার রাজনীতির আঙিনায় এখন এক নজিরবিহীন নাটকীয় পরিস্থিতি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটলেও, কুর্সি ছাড়তে নারাজ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হারের গ্লানি কাটিয়ে রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগ করার বদলে তিনি সোজা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন এবং জয়ী দল বিজেপি-কে। এই ঘটনা নিয়ে এবার সরব হয়েছেন বলিউডের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক রাম গোপাল বর্মা।
মমতার আচরণে স্তম্ভিত রাম গোপাল বর্মা
রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সব সময়ই স্পষ্টবক্তা হিসেবে পরিচিত রাম গোপাল বর্মা বা আরজিভি। বাংলার এই উত্তাল পরিস্থিতিতে এক্স হ্যান্ডেলে (পুরানো টুইটার) একটি পোস্ট করে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, “রাজনীতিতে এত দশক কাটানোর পর এবং ১৫ বছর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরেও আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়টি উপেক্ষা করছেন।” পরিচালকের মতে, গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ বা ‘DNA’ হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ। আর সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন নির্বাচন কমিশন) ওপর আক্রমণ চালানো মানেই হলো খোদ গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানা। বর্মার এই টুইট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়েছে এবং রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
নির্বাচনী ফলাফল ও মমতার ‘বিদ্রোহ’
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা জুড়ে গেরুয়া ঝড় বয়ে গিয়েছে। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যেখানে ম্যাজিক ফিগার ছিল মাত্র ১৪৮। অন্যদিকে, গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস নেমে এসেছে মাত্র ৮০টি আসনে। গাণিতিক হিসেবে বিজেপির জয় প্রশ্নাতীত হলেও, তৃণমূল নেত্রীর দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রীতিমতো রণংদেহি মেজাজে উপস্থিত হন। তিনি স্পষ্ট জানান, “আমি পদত্যাগ করব না। আমি হারিনি। আমি রাজভবনে যাব না… এ প্রশ্নই ওঠে না। আমরা নির্বাচনে হারিনি। নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তারা হয়তো দাপ্তরিকভাবে আমাদের পরাজিত করতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে আমরাই এই নির্বাচনে জয়ী হয়েছি।”
মারধর ও কারচুপির অভিযোগ
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ‘লুট’ করা হয়েছে। তিনি আরও মারাত্মক অভিযোগ তুলে বলেন, ভোট গণনার সময় তাঁকে শারীরিকভাবে হেনস্তা বা মারধর করা হয়েছে। গণনা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল যাতে তৃণমূল এজেন্টদের ওপর হামলা চালানো যায়। তিনি নিজেকে ‘রাস্তার মেয়ে’ হিসেবে অভিহিত করে হুঙ্কার দিয়েছেন যে, তিনি আবার রাস্তায় নেমেই এই ‘লুট’-এর বিরুদ্ধে লড়াই করবেন।
মমতার এই অবস্থানের ফলে বাংলায় এক সাংবিধানিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো সত্ত্বেও একজন মুখ্যমন্ত্রী যদি পদত্যাগ না করেন, তবে রাজ্যপাল কী পদক্ষেপ নেবেন, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ। একদিকে বিজেপির সরকার গঠনের প্রস্তুতি, অন্যদিকে মমতার হার না মানার জেদ—এই দুয়ের মাঝে পড়ে বাংলার ভবিষ্যৎ এখন বড়সড় অনিশ্চয়তার মুখে।





