ইন্টারনেট ছাড়াই ইউপিআই পেমেন্ট! আসছে ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’, বিপ্লব ঘটতে চলেছে ডিজিটাল লেনদেনে!

কল্পনা করুন, আপনি আকাশে ওড়ার সময় বিমানে বসে কফির দাম মেটাচ্ছেন কিংবা দিল্লি মেট্রোর সুড়ঙ্গে দাঁড়িয়ে কোনও জলখাবার কিনছেন, অথচ আপনার ফোনে বা মার্চেন্টের ডিভাইসে বিন্দুমাত্র ইন্টারনেট সংযোগ নেই। খুব শীঘ্রই এই যুগান্তকারী বিষয়টি বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে। ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত সরকার এবং ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এনপিসিআই) যৌথভাবে ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই-এর একটি দুর্দান্ত অফলাইন ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’ সুবিধা চালুর জোরদার প্রস্তুতি শুরু করেছে। এই বিপ্লবের ফলে গ্রাহকরা তাঁদের স্মার্টফোন এবং মার্চেন্টের পিওএস মেশিন—দুটোই সম্পূর্ণ অফলাইনে থাকা সত্ত্বেও অতি সহজে পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারবেন। মনে করা হচ্ছে, এই যুগান্তকারী ব্যবস্থা ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট পরিকাঠামোর সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘদিনের ঘাটতি নিখুঁতভাবে পূরণ করবে।
কীভাবে কাজ করবে এই তাক লাগানো প্রযুক্তি? প্রস্তাবিত এই অত্যাধুনিক ফিচারটি ‘নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন’ বা এনএফসি (NFC) প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ ভিত্তি করে কাজ করবে। বর্তমানে আমরা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে যে ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’ সুবিধা ব্যবহার করে থাকি, এটি ঠিক সেই একই বৈপ্লবিক মডেলে কাজ করবে। ‘নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন’ হল একটি স্বল্প-পরিসরের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি, যা মাত্র ৪ সেমি বা ১.৬ ইঞ্চি কিংবা তার কম দূরত্বে অত্যন্ত দ্রুত ও সম্পূর্ণ নিরাপদে দুটি ডিভাইসের মধ্যে ডেটা আদান-প্রদান করতে সক্ষম। এই নতুন পরিষেবা পেতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে ইন্টারনেট সংযোগ সচল থাকা অবস্থাতেই তাঁদের ‘ইউপিআই লাইট’ ওয়ালেটে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা লোড করে রাখতে হবে। ওয়ালেটে পর্যাপ্ত টাকা জমা হয়ে গেলে, তাঁরা কেবল এনএফসি-সক্ষম স্মার্টফোনটি একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ পিওএস টার্মিনালের ওপর ঠেকিয়ে বা সামান্য ‘ট্যাপ’ করেই নিমেষে পেমেন্ট করতে পারবেন। এমনকি পেমেন্ট করার সময় দু’টি ডিভাইসের কোনোটিতেই যদি বিন্দুমাত্র ইন্টারনেট সংযোগ না থাকে, তবুও লেনদেন আটকাবে না। মার্চেন্ট টার্মিনালটি পেমেন্টের অনুমোদন বা অথোরাইজেশন নিজেদের সিস্টেমে সুরক্ষিতভাবে জমা রাখবে এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেট সংযোগ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রধান ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিঙ্ক করে নেবে। যেহেতু এই ক্ষেত্রে সমস্ত টাকা আগে থেকে লোড করা ‘ইউপিআই লাইট’ ব্যালেন্স থেকে খরচ হবে, তাই এই সুরক্ষিত লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারীদের কোনো ধরনের ইউপিআই পিন মুখস্থ রাখার বা টাইপ করারও প্রয়োজন পড়বে না।
কোথায় সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে এই প্রযুক্তি? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তিটি মূলত এমন সব চ্যালেঞ্জিং জায়গায় কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে যেখানে ইন্টারনেটের নামগন্ধ থাকে না বা সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন হওয়ার মারাত্মক সমস্যা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—চলন্ত বিমান, ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশন, দুর্গম গ্রামীণ এলাকা এবং সুউচ্চ বাণিজ্যিক ভবন বা মল, যেখানে সেলুলার নেটওয়ার্কের ওপর অত্যধিক চাপের কারণে ফোন প্রায়ই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এই ধরনের জটিল পরিবেশে প্রচলিত ইউপিআই লেনদেন প্রতিবারই মুখ থুবড়ে পড়ে, কারণ সেগুলোর ক্ষেত্রে পেমেন্টকারী এবং মার্চেন্ট—উভয় পক্ষকেই রিয়েল-টাইমে অনলাইনে থাকার প্রয়োজন হয়। নতুন এই অফলাইন ‘ট্যাপ-অ্যান্ড-গো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে একবারে সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা পর্যন্ত পেমেন্ট করা অনায়াসেই সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। যদিও এই নতুন ফিচারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা গাইডলাইন নিয়ে এখনও এনপিসিআই-এর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবুও ২০২৩ সালে চালু হওয়া ‘ইউপিআই লাইট এক্স’-এর ধারণাকে এটি বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। এর জন্য আর আলাদা করে দুটি এনএফসি ফোন লাগবে না, বরং যেকোনো পিওএস টার্মিনালেই লেনদেন হবে। সফলভাবে চালু হলে দুর্বল নেটওয়ার্কের জমানা ফুরোবে এবং ডিজিটাল পেমেন্ট আরও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে।