ইতিহাসের পাতায় মার্কিন আগ্রাসন, ইরাক থেকে চূড়ান্ত বিদায়ের দিনক্ষণ ঘোষণা

২৩ বছর ধরে চলা দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়ের ইতি টানতে চলেছে আমেরিকা। ইরাক থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরাকের মাটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আর কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, “আমরা সাহায্য এবং সুরক্ষার বার্তা নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম, কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের সম্পর্ক এখন ভিন্ন রূপ নিয়েছে, যেখানে সামরিক বাহিনীর আর কোনো ভূমিকা নেই।”
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মার্কিন বাহিনী ইরাক থেকে সম্পূর্ণভাবে বিদায় নেবে। তবে এই প্রস্থান মানেই মার্কিন সংস্থার পুরোপুরি চলে যাওয়া নয়; বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য কূটনৈতিক কার্যক্রম বজায় থাকবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া এক বিতর্কিত ও দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন অভিযানের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।
২০০৩ সালের মার্চ মাসে ‘শক অ্যান্ড অ’ (Shock and Awe) নামক ব্যাপক বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইরাকে আগ্রাসন শুরু করেছিল মার্কিন বাহিনী। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of Mass Destruction) লুকানো আছে—এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই আমেরিকা সেই আক্রমণ চালিয়েছিল। বাগদাদ দখল এবং সাদ্দাম সরকারের পতনের পর তল্লাশি চালিয়েও পরবর্তীতে ওই ধরনের কোনো অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
২০০৭ সালে বিদ্রোহ দমনের চরম পর্যায়ে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা রেকর্ড ১ লক্ষ ৭০ হাজারে পৌঁছে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বারাক ওবামা প্রশাসনের উদ্যোগে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বেশিরভাগ সেনা ইরাক ত্যাগ করে। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে যখন ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান ঘটে। ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল অংশ আইএসের দখলে চলে গেলে, ইরাক সরকারের বিশেষ অনুরোধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী পুনরায় সেখানে ফিরে আসে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২১ সালে আইএস-এর হাত থেকে অঞ্চল পুনর্দখল করা সম্ভব হয় এবং যৌথ সামরিক বাহিনী ইরাক ছেড়ে চলে যায়।
এরপরও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং ইরাকি সেনাদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ২,৫০০ মার্কিন জওয়ান ইরাকে মোতায়েন ছিল। তবে বর্তমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, ইরাকি বাহিনী এখন নিজস্ব সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অস্থিরতা, রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মার্কিন সেনার এই প্রস্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ইরাকের মাটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির এই অবসানকে বিশ্লেষকরা একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবেই দেখছেন।