আমফানের ত্রাণে মেগা দুর্নীতি! একই অ্যাকাউন্টে বারবার টাকা থেকে ভুয়ো ভোটার কার্ড, CAG রিপোর্টে ফাঁস বিস্ফোরক তথ্য

আমফান ঘূর্ণিঝড়ের ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা বণ্টন নিয়ে রাজ্যজুড়ে ফের একবার তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শোরগোল শুরু হয়েছে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি (CAG)-এর সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে আমফানের ত্রাণ তহবিল বন্টনে নজিরবিহীন নয়ছয় এবং একাধিক গুরুতর অসঙ্গতির তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এর আগে বাড়ি তৈরির অনুমোদনে নানা অনিয়মের তথ্য সামনে এলেও, এবারের সিএজি রিপোর্টে কৃষি এবং উদ্যানপালন সহায়তার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল খাতে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, আমফানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও উদ্যানপালকদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে বারবার টাকা জমা হওয়া, ভুয়ো বা একাধিক নথিতে নাম নথিভুক্ত করা, কোনো ধরনের আবেদনপত্র ছাড়াই সরকারি সাহায্য প্রদান এবং প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি অর্থ বরাদ্দের মতো একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
সিএজি সূত্রে জানা গেছে, আমফানের পর রাজ্যের ৯টি জেলার কৃষি ফসলের ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোট ২৩.৪২ লক্ষ উপভোক্তার মাঝে প্রায় ৩৫২.৫৯ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু অডিটে ছ’টি নির্বাচিত জেলার তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতেই চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসে। দেখা গেছে, অন্তত ৬৫০ জন উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে একাধিক কিস্তি বা লেনদেনের মাধ্যমে মোট ২৪.৩৩ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত জমা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪৮ জন দু’বার করে এবং একজন উপভোক্তা তিনবার সহায়তা পেয়েছেন। এমনকি এক ব্যক্তি তাঁর মোট ৯টি ভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় ১২ বার সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই ৬৫০ জনের ক্ষেত্রে মোট ১,৩১১টি সন্দেহজনক লেনদেন করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি সহায়তার জন্য ব্যবহৃত ‘কৃষক বন্ধু অ্যাসিওর্ড ইনকাম স্কিম’ বা KBAIS পোর্টালে একই কৃষক বা ভাগচাষির নামে একাধিকবার নথিভুক্তির গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়েছে। ছ’টি জেলায় প্রায় ২,৬৯৭ জন উপভোক্তার একাধিক কেবিএআইএস এনরোলমেন্ট ছিল, যার পেছনে একটিমাত্র বৈধ ভোটার পরিচয়পত্র বা EPIC নম্বর কিংবা সামান্য পরিবর্তন করা ভুয়ো EPIC নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে অস্তিত্ব নেই এমন ভুয়ো এপিক নম্বর ব্যবহার করেও বহু মানুষ সরকারি সহায়তা তুলে নিয়েছেন।
উদ্যানপালন সহায়তার ক্ষেত্রেও দুর্নীতির মাত্রা সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে সিএজি জানিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পান-বরজ বা পানচাষিদের সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্লকের সহকারী কৃষি অধিকর্তার কাছে নির্দিষ্ট আবেদন জমা দিতে হয় এবং তা ফিল্ড কনসালট্যান্ট ও ব্লকস্তরের তিন সদস্যের কমিটির দ্বারা যাচাই হওয়ার পরই টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু অডিট রিপোর্টে দেখা গেছে, পূর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার তিনটি ব্লকে ১৮,৩৫৯ জন পানচাষির মধ্যে অন্তত ৫,৬২৭ জনকে কোনো ধরনের আবেদনপত্র বা মাঠপর্যায়ের যাচাই ছাড়াই সরাসরি ২.৮২ কোটি টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এই ৫,৬২৭ জনের নামের তালিকা আমফানের পর নতুন করে তৈরিই করা হয়নি; বরং ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর ক্ষয়ক্ষতির সময় প্রস্তুত করা পুরনো উপভোক্তার তালিকা ব্যবহার করেই এই বিপুল অঙ্কের টাকা বিলি করা হয়েছে। ফলে আমফানে বাস্তবে তাঁরা আদৌ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন কি না, তা যাচাই করার ন্যূনতম প্রয়োজনও কেউ অনুভব করেননি।
শুধু তাই নয়, উদ্যানপালন খাতে মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির ৯৫.৩৩ শতাংশকেই সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে একটি নির্দিষ্ট চাষের ওপর একপেশে অর্থ বরাদ্দের গুরুতর অভিযোগ তুলেছে সিএজি। রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে মোট ১,৮६,৩৬২.৮৭ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত জমির হিসাব দেখিয়ে ২৭৩.৭৬ কোটি টাকা সহায়তা দাবি করলেও, বাস্তবে কৃষি দফতর মাত্র ৮১.২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করে এবং তার প্রায় পুরোটাই শুধুমাত্র পানচাষিদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, মুর্শিদাবাদ এবং পূর্ব বর্ধমানের মতো জেলাগুলিতে অন্যান্য উদ্যানপালন ফসলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ১০০ শতাংশই সরকারি সাহায্যের বাইরে থেকে গেছে। অথচ পানচাষে ক্ষতির যে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তার তুলনায় প্রায় ৬৫.৬২ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ করা হয়েছে। কৃষি ও উদ্যানপালন দফতরের পক্ষ থেকে পোর্টালে সফটওয়্যারের সীমাবদ্ধতা ও স্বল্প সময়ের চাপের কথা বলে সাফাই দেওয়া হলেও, সিএজি দফতরের সেই সমস্ত যুক্তি একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছে। সবমিলিয়ে, আমফানের ত্রাণ বণ্টনে এই বিরাট আর্থিক অনিয়মের সত্যতা ফাঁস হওয়ার পর প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।