আধার-ভোটার কার্ডের পর পাসপোর্টও নয় নাগরিকত্বের প্রমাণ! তবে কি আপনার পরিচয়পত্র সব ভুয়ো?

পাসপোর্ট আছে মানেই আপনি ভারতের নাগরিক—এই ধারণাটি এবার ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হতে চলেছে। ১৪তম ‘পাসপোর্ট সেবা দিবস’ উপলক্ষে বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) সাম্প্রতিক ঘোষণা ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, পাসপোর্ট কোনোভাবেই ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত বা অকাট্য নথি নয়। এই ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, তবে দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার অকাট্য দলিল আসলে কোনটি?
পাসপোর্ট কেন নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়?
বিদেশ মন্ত্রকের যুক্তি অনুযায়ী, পাসপোর্ট মূলত একটি ‘ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ বা ভ্রমণের নথি। সরকার নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুবিধার্থেই এটি ইস্যু করে থাকে। কিন্তু একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য এখানে বিদ্যমান—আইন অনুযায়ী অ-নাগরিকদের পাসপোর্ট দেওয়া নিষিদ্ধ, তবুও এটি নাগরিকত্বের আইনি প্রমাণ নয়। এমনকি পাসপোর্টের মলাটেই লেখা থাকে, এটি ‘ভারত সরকারের সম্পত্তি’ এবং সরকার যে কোনো সময় তা প্রত্যাহারের অধিকার রাখে। পাসপোর্ট মূলত একজন ব্যক্তির পরিচয় এবং ভ্রমণে তার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু তা নাগরিকত্বের সাংবিধানিক মর্যাদা নিশ্চিত করে না।
আধার বা ভোটার কার্ডও একই সারিতে:
গত কয়েক বছরে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্কে আধার এবং ভোটার কার্ডকে কেন্দ্র করেও একই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বছরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, আধার কার্ড কেবলই ‘আইডেন্টিটি ডকুমেন্ট’ বা পরিচয়ের প্রমাণ, নাগরিকত্বের নয়। একই যুক্তিতে ভোটার কার্ডও শুধুমাত্র ঠিকানার প্রমাণ এবং ভোটদানের অধিকারের দলিল। ফলে আধার, ভোটার কার্ড এবং পাসপোর্টের কোনোটিই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত সিলমোহর নয়।
নাগরিকত্বের মাপকাঠি কী?
ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয় জন্মসূত্রে বা নির্দিষ্ট সময়সীমার ভিত্তিতে:
১৯৫০-এর ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৭-এর ১ জুলাই পর্যন্ত ভারতে জন্মগ্রহণকারী যেকোনো ব্যক্তিই ভারতীয়।
১৯৮৭-এর ১ জুলাইয়ের পর জন্ম হলে, পিতা বা মাতার মধ্যে অন্তত একজনকে ভারতীয় হতে হবে।
২০০৪-এর ৩ ডিসেম্বর থেকে নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে—এক্ষেত্রে পিতা-মাতা উভয়কেই ভারতীয় হতে হবে, অথবা একজনকে ভারতীয় এবং অন্যজনকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হওয়া চলবে না।
পাসপোর্ট পরিষেবার খতিয়ান:
নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বিদেশ মন্ত্রক তাদের পরিষেবার সাফল্যের খতিয়ানও তুলে ধরেছে। গত এক দশকে পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্রের সংখ্যা ৭৭ থেকে বেড়ে ৫৪৫ হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাদে মাত্র ৬ কর্মদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রকের লক্ষ্য—খুব শীঘ্রই চিপ-যুক্ত ‘ই-পাসপোর্ট’ পরিষেবা চালু করা। গত ২০২৫ সালে ১.৩৯ কোটি পাসপোর্ট পরিষেবা প্রদান করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে এই নথিগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও, পাসপোর্ট পরিষেবার আধুনিকীকরণে ভারত সরকার যে অভাবনীয় গতি এনেছে, তা পরিসংখ্যানের মাধ্যমেই স্পষ্ট।