‘আদর্শ প্রতিবেশী’ খোঁজে জামাত! ধর্ম-বর্ণ ভুলে সৌহার্দ্যের বার্তা, শহরে-গ্রামে বাড়তে থাকা ‘আত্মকেন্দ্রিকতা’ কাটাতে বড় পদক্ষেপ

দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজ, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং রাজনীতির প্রভাবে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যখন তলানিতে, ঠিক তখনই ‘আদর্শ প্রতিবেশী, আদর্শ সমাজ’ স্লোগানকে সামনে রেখে এক ভিন্ন বার্তা নিয়ে মাঠে নামল জামাত-ই-ইসলামি হিন্দ (JIH)। সমাজের ক্ষয়িষ্ণু মানবিক মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুরু হয়েছে ১০ দিনের বিশেষ প্রচার অভিযান— ‘রাইটস অফ নেইবার্স ক্যাম্পেইন’।
কেন এই অভিযান?
সংগঠনের অভিযোগ, বর্তমান সমাজে মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে যে একই পাড়া বা ফ্ল্যাটে থেকেও পাশের মানুষের খোঁজ রাখে না। যার ফলে, বহু ক্ষেত্রে পচা গন্ধ না বেরোনো পর্যন্ত প্রতিবেশীর মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও অজানা থেকে যায়। এই ‘পচে যাওয়া সমাজের’ বদল ঘটাতে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যেই ২১ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এই প্রচারের মূল লক্ষ্য শুধু বসতিগত প্রতিবেশী নয়, সহকর্মী বা সহযাত্রীদের মতো ‘অস্থায়ী প্রতিবেশী’-দের প্রতিও দয়া প্রদর্শনের আহ্বান জানানো। ধর্মীয় ভেদাভেদ, জাতপাতের রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে মানবিক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে জামাত-ই-ইসলামি হিন্দ।
আনুষ্ঠানিক সূচনা ও অভিযোগ:
কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে এই প্রচার অভিযানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাড়াও হিন্দু, খ্রিস্টান-সহ বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সকলেই একবাক্যে অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক কারণেই মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ বেড়েছে, যা সমাজকে দুর্বল করছে।
জামাত-ই-ইসলামি হিন্দের রাজ্য সভাপতি মসিউর রহমান বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বর্তমান ভারতে একাধিক বড় শহরে আবাসন বা টাউনশিপে কেউ সমস্যায় পড়লে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসে না। গ্রামেও সেই প্রবণতা কমছে। এটা দেশের জন্য ভালো নয়। বস্তুতান্ত্রিকতা পারস্পরিক সহযোগিতা কমাচ্ছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “রাজনৈতিক কারণে সাম্প্রদায়িকতার লেলিহান শিখা দাউদাউ করে জ্বলছে। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিবেশী সুলভ মনভাব হারিয়ে যাচ্ছে। প্রগতিশীল ভারতবর্ষ গড়তে যারা হিংসা ছড়াচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে আলাদা করতে হবে।”
সম্প্রীতি ও শিক্ষার বার্তা:
এই প্রচার অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অমুসলিম ভাই-বোনদের কাছে পৌঁছানো এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিকে জোরদার করার ওপর। পাশাপাশি, ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণার অবসান ঘটানোও কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মসিউর রহমান দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কোরআন কেবল বসতির প্রতিবেশীর প্রতিই নয়, বরং সহকর্মী বা পথচারীর মতো ক্ষণিকের ‘অস্থায়ী প্রতিবেশী’দের প্রতিও সদয় আচরণের নির্দেশ দেয়। এই প্রচারের মাধ্যমে সেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথা মুসলিম সমাজকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কর্মসূচিতে যা যা থাকছে:
শহরে বাড়তে থাকা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার প্রবণতাকে লক্ষ্য রেখে প্রতিবেশীদের সম্পর্ক মজবুত করতে এই ১০ দিনের প্রচারে একগুচ্ছ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
‘নিজের প্রতিবেশীকে জানো’ উদ্যোগ গ্রহণ।
মহল্লাভিত্তিক সাংস্কৃতিক সভা।
স্থানীয় কমিটি গঠন, যাতে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
সব ধর্মের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যমূলক বৈঠক ও চা-আড্ডা।
নারী ও যুবদের জন্য বিশেষ সভা।
পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সচেতনতা র্যালি এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা।
জামাতের পক্ষ থেকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীদের প্রতি নৈকট্য বৃদ্ধি, উপহার পাঠানো, বাড়িতে নিমন্ত্রণ করা, কষ্ট দূর ও আনন্দের ব্যবস্থা করা এবং নিজের ঘরের মতো প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলিতে জোর দেওয়া হয়েছে।