আত্মনির্ভর ভারতের বিরাট জয়! জলে ভাসল দেশের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘শ্রুতি’

ভারতীয় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার এক নতুন এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড বা জিআরএসই। নেক্সট জেনারেশন অফশোর পেট্রোল ভেসেল (এনজিওপিভি) বা উপকূলীয় এলাকায় টহলদারি জাহাজের দ্বিতীয় সংস্করণ ‘শ্রুতি’ জলে ভাসানোর মাধ্যমে দেশীয় জাহাজ নির্মাণ শিল্পে এক বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করা হলো। ভারতীয় নৌবাহিনীর সামুদ্রিক শক্তি বৃদ্ধি করতে নির্মিত এই যুদ্ধজাহাজটির উদ্বোধন করা হয় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে।
গত ২০ মে এই সিরিজের প্রথম যুদ্ধজাহাজ ‘সংঘমিত্রা’র উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় এই জাহাজটি তৈরির কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হলো। নৌবাহিনীর চিফ অব ওয়ারশিপ প্রোডাকশন অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন ভাইস অ্যাডমিরাল সঞ্জয় সাধুর উপস্থিতিতে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও সনাতন আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই জাহাজটিকে জলে ভাসানো হয়। কলকাতার গার্ডেনরিচে তৈরি এই রণতরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিএমডি কমোডর পি আর হরি সহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও জিআরএসই আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। চার বেদ এবং ভারতের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শ্রুতি’।
২০২৩ সালের ৩০ মার্চ মোট চারটি এনজিওপিভি তৈরির জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যার মধ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধজাহাজ হিসেবে ‘শ্রুতি’ তার অভিযান শুরু করল। অত্যাধুনিক নৌ-যুদ্ধ ব্যবস্থায় সজ্জিত এই জাহাজগুলির মূল লক্ষ্য হলো ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধ-প্রস্তুতি নিখুঁত রাখা এবং একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা। আত্মনির্ভর ভারতের জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে এবং উচ্চমাত্রায় দেশীয় প্রযুক্তির সমন্বয়ে নির্মিত এই রণতরীগুলি অত্যন্ত বহুমুখী ক্ষমতার অধিকারী।
রণতরী ‘শ্রুতি’-র কার্যক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক এবং এটি দীর্ঘ সময় সমুদ্রে একটানা কার্যক্রম চালাতে সক্ষম। এর বহুমুখী কার্যক্ষমতার মধ্যে রয়েছে সমুদ্র তীরবর্তী প্রতিরক্ষা, নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে জরুরি অভিযান, সাধারণ নাগরিকদের সফল উদ্ধার অভিযান, জলদস্যু-বিরোধী এবং অনুপ্রবেশ-বিরোধী কড়া কার্যক্রম। তাছাড়া, এটিকে প্রয়োজনে হাসপাতাল জাহাজ, নৌ-বহর রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহকারী জাহাজ হিসেবেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্যও এটি সম্পূর্ণ উপযুক্ত।
এই যুদ্ধজাহাজটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর ওপর হেলিকপ্টার রাখার উন্নত ব্যবস্থা। বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য এতে ‘নেক্সট জেনারেশন হেলিকপ্টার হার্নেসিং অ্যান্ড ট্রাভার্সিং সিস্টেম’ বা এনজিএইচএইচটিএস যুক্ত করা হয়েছে। কারিগরি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিচার করলে, যুদ্ধজাহাজটির মোট দৈর্ঘ্য ১১৩ মিটার এবং প্রস্থ ১৪.৬ মিটার। এর নকশা অনুযায়ী ওজন বা ডিসপ্লেসমেন্ট প্রায় ৩০০০ টন এবং এর সর্বোচ্চ গতি প্রতি ঘণ্টায় ২৩ নট। ১৪ নট গতিতে এটি একটানা ৮০০০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।
এনজিওপিভি-টিতে বসানো হয়েছে একেবারে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও সেন্সর। যার মধ্যে রয়েছে উন্নত সুপার র্যাপিড গান মাউন্ট, একে-৬৩০, স্টেবিলাইজড রিমোট কন্ট্রোল গান এবং লিঙ্কস ইউ টু সিস্টেম। জলের নীচে প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের আধুনিক সক্ষমতার জন্য এতে যুক্ত করা হয়েছে অ্যাডভান্সড টর্পেডো ডিফেন্স সিস্টেম, ইএসএম বরুণা। সর্বোপরি, ২৪ জন সংশ্লিষ্ট আধিকারিক ও ১২৪ জন নাবিকের সমন্বয়ে পরিচালিত হওয়ার উপযোগী করে এই রণতরীটি তৈরি করা হয়েছে। যা ভারতীয় নৌবাহিনীকে সামুদ্রিক নজরদারি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী আধুনিক সম্পদ প্রদান করল। জিআরএসই-র চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর কমোডর পি আর হরি জানান, গত বছর আটটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা হয়েছে এবং চলতি বছর জিআরএসই মোট পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করে নৌ-সেনাকে হস্তান্তর করেছে। ১৯৬১ সালে ভারতের প্রথম দেশীয় যুদ্ধজাহাজ ‘আইএনএস অজয়’ তৈরি থেকে শুরু করে জিআরএসই এ পর্যন্ত বহু রণতরী তৈরি করেছে। চলতি বছরের জুন মাসে জিআরএসই ‘নবরত্ন’ মর্যাদা লাভ করেছে এবং তারপরেই ‘শ্রুতি’র এই উন্মোচন ভারতীয় নৌবাহিনীকে আরও বহুগুণ বেশি শক্তিশালী করে তুলল।