আকাশপথ থেকে সড়কপথ—পরিবর্তনের হাওয়া উত্তরবঙ্গে, অর্থনৈতিক বিপ্লবের নেপথ্যে কী?

কয়েক দশক ধরে ভারতীয় ভূ-রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গ পরিচিত ছিল মূলত ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডর হিসেবে। মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার চওড়া এই ভূখণ্ড ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র জীবনরেখা। তবে সেই পরিচিতি ছাপিয়ে আজ উত্তরবঙ্গ লিখছে উন্নয়নের নতুন আখ্যান। কৌশলগত গুরুত্বের পাশাপাশি অঞ্চলটি এখন দেশের অন্যতম প্রধান ‘অর্থনৈতিক করিডর’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায়।
কেন গুরুত্ব বাড়ছে উত্তরবঙ্গের? ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে এই অঞ্চল। কেন্দ্রের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিকে কার্যকর করতে উত্তরবঙ্গকে একটি বৃহৎ হাব হিসেবে দেখছে বিশেষজ্ঞ মহল।
পরিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন: অঞ্চলটির সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে সরকারি ও বেসরকারি স্তরে চলছে বিশাল বিনিয়োগ:
এভিয়েশন হাব: বাগডোগরা বিমানবন্দর সম্প্রসারণে ১,৫৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাসিমারা বিমানবন্দরে অসামরিক বিমান পরিষেবা চালুর তোড়জোড় চলছে।
যোগাযোগের নতুন দিগন্ত: বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, আধুনিক জাতীয় সড়ক এবং মালবাহী করিডরের নেটওয়ার্ক উত্তরবঙ্গকে দেশের লজিস্টিকস খাতের অন্যতম স্তম্ভে পরিণত করছে।
বাণিজ্যিক রাজধানী শিলিগুড়ি: শিলিগুড়ি এখন কেবল ট্রানজিট শহর নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রিয়েল এস্টেট এবং লজিস্টিকস ব্যবসায় এটি একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই অঞ্চলে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করছে।
সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র: পর্যটন শিল্পে দার্জিলিং, কালিম্পং এবং ডুয়ার্সকে বিশ্বমানের পরিকাঠামোয় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া চা শিল্পের আধুনিকীকরণ এবং ‘টিবক্স’-এর মতো সফল স্টার্টআপগুলো প্রমাণ করেছে, এই অঞ্চল থেকেও বিশ্বমানের ব্যবসা পরিচালনা সম্ভব। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পেও নতুন স্টার্টআপ গড়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্য: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধুমাত্র পরিকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন:
দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি।
বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য শিল্পবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের জটিলতা কমিয়ে তা সহজতর করা।
শেষ কথা: একসময় যে অঞ্চলকে জাতীয় নিরাপত্তার নিরিখে শুধুমাত্র একটি করিডর হিসেবে দেখা হতো, আজ তা পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠার পথে। এই সম্ভাবনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারলে আগামী দশকে উত্তরবঙ্গ হয়ে উঠবে পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্রের অন্যতম প্রধান উজ্জ্বল বিন্দু।