অম্বুবাচীতে কেন বন্ধ থাকে মন্দিরের দরজা? ধরিত্রী মায়ের এই বিশেষ ব্রত সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন

আষাঢ় মাসের ৭ তারিখ, অর্থাৎ চলতি বছরের ২২ জুন (সোমবার) সন্ধ্যা ৭টা ৩৮ মিনিট থেকে শুরু হচ্ছে অম্বুবাচী। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়কালটিতে ধরিত্রী মা ঋতুমতী হন। তাই এই তিন দিন ধরিত্রীর ওপর কোনো প্রকার কৃষি কাজ বা মাটি খোঁড়া নিষিদ্ধ। ২৬ জুন (শুক্রবার) রাত ১০টা ৫৭ মিনিটে অম্বুবাচীর নিবৃত্তি বা সমাপ্তি ঘটবে।

কেন পালিত হয় অম্বুবাচী? হিন্দু শাস্ত্র ও পুরাণ অনুসারে, অম্বুবাচী হলো ধরিত্রীর রজঃস্বলা হওয়ার সময়। লোকবিশ্বাস, এই সময়ে ধরিত্রী মা বিশ্রাম নেন এবং নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করেন। এই তিন দিন পৃথিবী অশুচি থাকে বলে মনে করা হয়, তাই দেব-দেবীর নিত্যপুজোর নিয়মকানুনগুলো ভিন্নভাবে পালন করা হয়।

মন্দির ও পূজার নিয়মকানুন: অম্বুবাচী চলাকালীন দেশের সব মন্দিরে বিশেষ বিধি নিষেধ মানা হয়। অসমের কামাখ্যা মন্দিরে এই তিন দিন দেবী দর্শনের দ্বার বন্ধ থাকে। তবে তারাপীঠ মন্দির এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তারাপীঠকে সতীপীঠ নয়, বরং সাধনা ক্ষেত্র বলে মনে করা হয়, তাই সেখানে অম্বুবাচীর সময়ও নিত্যপুজো, ভোগ ও আরতি স্বাভাবিক নিয়মেই চলে।

সাধারণের জন্য নির্দেশিকা: পুরোহিতদের মতে, গৃহস্থের পক্ষে সব নিয়ম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মানা সম্ভব না হলেও কিছু মৌলিক বিষয় মেনে চলা বাঞ্ছনীয়:

  • মূর্তি ঢেকে রাখা: বাড়িতে বা মন্দিরে যদি মাতৃশক্তির মূর্তি থাকে, তবে তা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। ছবির ক্ষেত্রে এই নিয়ম বাধ্যতামূলক নয়, কারণ মূর্তিতেই প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়।

  • ভোগ ও পুজো: অম্বুবাচীর সময় সিংহাসন স্পর্শ করা বারণ। মূর্তিকে না ছুঁয়ে সামনে জলের সঙ্গে বাতাসা, সন্দেশ বা ফল ভোগ দেওয়া যায়। ধূপ-প্রদীপও জ্বালানো যেতে পারে। তবে এই তিন দিন দেবীকে ফুল, বেলপাতা বা তুলসী নিবেদন করা নিষিদ্ধ।

  • বিধবাদের নিয়ম: সনাতন রীতি অনুযায়ী, বিধবা মহিলারা এই তিন দিন আগুনের রান্না করেন না। তারা ফলমূল খেয়ে ব্রত পালন করেন এবং ঠাকুরের নাম জপ করেন।

  • অন্যান্য: যদি কোনো সিংহাসনে সব দেব-দেবীর মূর্তি থাকে, তবে অম্বুবাচী শুরুর আগেই মূর্তিগুলো অন্যত্র সরিয়ে রাখা ভালো।

অম্বুবাচী নিবৃত্তির পর: ২৬ জুন রাত ১০টা ৫৭ মিনিটে অম্বুবাচীর নিবৃত্তি ঘটবে। এর পরবর্তী সময়ে বা পরদিন সকালে জামাকাপড় ও বিছানা সাবান দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। স্নান ও শুদ্ধি করার পর থেকে দৈনন্দিন কাজকর্ম ও দেব-দেবীর পুজোর স্বাভাবিক রীতিনীতি শুরু করা যায়। কামাখ্যা সহ সমস্ত সতীপীঠের মন্দিরের দরজা এরপর ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

শাস্ত্র অনুযায়ী, অম্বুবাচীর পর ধরিত্রী মা পুনরায় শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠেন, যা আমাদের প্রকৃতির সৃষ্টির শক্তিরই প্রতীক। এই উৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মাটির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক প্রাচীন ঐতিহ্য।