আজ ১৬ এপ্রিল, ২০২৬। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা লোকসভা ও বিধানসভা আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ (Delimitation) প্রক্রিয়া শুরু করতে আজ বিশেষ অধিবেশনে বিল পেশ করছে কেন্দ্র। এই বিলের প্রভাবে বদলে যেতে চলেছে আপনার নির্বাচনী এলাকা এবং দিল্লির মসনদে বসার সমীকরণ।
কী আছে এই নতুন ডিলিমিটেশন বিলে?
সরকারের প্রস্তাবিত ‘সংবিধান (একত্রিশ তম সংশোধনী) বিল, ২০২৬’-এর মূল লক্ষ্য হলো ভারতের সংসদীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। এক নজরে দেখে নিন প্রধান দিকগুলো:
সাংসদ সংখ্যার বিস্ফোরণ: লোকসভার বর্তমান আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজ্যগুলির জন্য ৮১৫টি এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য ৩৫টি আসন সংরক্ষিত থাকবে।
২০২৯-এ মহিলা সংরক্ষণ: ২০৩৪ সালের অপেক্ষা না করে, ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটেই নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন নিশ্চিত করতে চায় কেন্দ্র। আর এই লক্ষ্যে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
PoK-তে নির্বাচনের নীল নকশা: পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর (PoK) যদি ভারতের নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে সেখানেও নির্বাচনী এলাকা বিন্যাস ও ভোট করানোর ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে কমিশনকে।
শক্তিশালী কমিশন: সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কমিশন গঠিত হবে, যাদের সিদ্ধান্তকে কোনো আদালতেই চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
কেন এই বিল নিয়ে বিতর্ক?
এই বিল ঘিরে ইতিমধ্যেই ভারতের রাজনীতি দ্বিধাবিভক্ত। বিতর্কের মূলে রয়েছে ‘জনসংখ্যা বনাম প্রতিনিধিত্ব’।
দক্ষিণ ভারতের মাথাব্যথা: তামিলনাড়ু, কেরালা বা কর্ণাটকের মতো দক্ষিণী রাজ্যগুলি সফলভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করেছে। অন্যদিকে উত্তর ভারতে (যেমন উত্তরপ্রদেশ, বিহার) জনসংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। যদি জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বিন্যাস হয়, তবে লোকসভায় উত্তর ভারতের ক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে এবং জাতীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে দক্ষিণী রাজ্যগুলি।
মমতার বিস্ফোরক অভিযোগ: বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই একে ‘দেশ ভাগের চক্রান্ত’ বলে তোপ দেগেছেন। তাঁর মতে, এই বিলের মাধ্যমে বিরোধী রাজ্যগুলির কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হচ্ছে।
এক নজরে ডিলিমিটেশন বিল ২০২৬-এর গাণিতিক সমীকরণ:
| বিষয় | বর্তমান পরিস্থিতি | প্রস্তাবিত পরিবর্তন |
| লোকসভা আসন | ৫৪৩ | ৮৫০ (প্রায় ৫০% বৃদ্ধি) |
| ভিত্তি বছর | ২০০১ (সীমানা) / ১৯৭১ (আসন সংখ্যা) | ২০১১ (২০২৯ নির্বাচনের জন্য) |
| মহিলা সংরক্ষণ | নেই | ৩৩% (২০২৯ থেকেই কার্যকর) |
| আদালতের হস্তক্ষেপ | সীমিত | অসম্ভব (আইনি কবচ দেওয়া হয়েছে) |
ভারতের জনসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই আসন বৃদ্ধিকে প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় মনে করা হলেও, এর রাজনৈতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আঞ্চলিক বৈষম্য নাকি শক্তিশালী গণতন্ত্র— ডিলিমিটেশন ভারতকে কোন পথে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার।





