হিন্দি নয়, ইংরেজি ‘H’ আকৃতির এই ভবনেই লেখা হয়েছিল বাঙালির ভাগ্য! জানুন বঙ্গ বিধানসভার অজানা ইতিহাস

তিলোত্তমার বুকে ইংরেজি ‘H’ অক্ষরের মতো দেখতে এক রাজকীয় ভবন। যার প্রতিটি ইট, প্রতিটি অলিন্দ সাক্ষী রয়েছে ইতিহাসের চরম উত্থান-পতনের। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অবসান থেকে শুরু করে বামেদের ৩৪ বছরের একাধিপত্য এবং ঘাসফুল শিবিরের জয়যাত্রা— পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভবন মানেই এক জীবন্ত মহাকাব্য। ২০২৬-এর হাইভোল্টেজ নির্বাচনের আগে ফিরে দেখা যাক এই শতাব্দীপ্রাচীন ভবনের রোমহর্ষক সফরনামা।

ব্রিটিশ স্থপতির অমর সৃষ্টি

১৯২৮ সালে স্থপতি গ্রিভস যখন এই ভবনের নকশা তৈরি করেন, তখন বাতাসের যাতায়াতের সুবিধার জন্য একে ‘H’ আকৃতি দিয়েছিলেন। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এটি ছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রতীক। ১৯৩১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ধুমধাম করে উদ্বোধন হওয়া এই ভবনের তামার গম্বুজ আজও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে।

প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও দেশভাগের রক্তক্ষয়

১৯৩৭ সালে প্রথম নির্বাচনের পর বাংলার দায়িত্ব নেন ‘বাংলার বাঘ’ এ. কে. ফজলুল হক। তখন অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী পদ ছিল না, বলা হতো ‘প্রধানমন্ত্রী’। কিন্তু এই ভবনের সবথেকে অন্ধকার দিন ছিল ১৯৪৭-এর ২০ জুন। বাইরে যখন দাঙ্গার আগুন জ্বলছে, তখন এই কক্ষের ভেতরেই নির্ধারিত হয়েছিল বাংলার মানচিত্র। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সেই রক্তমাখা ইতিহাস আজও এই ভবনের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।

বিধান রায়ের যুগ ও এককক্ষীয় আইনসভা

স্বাধীন ভারতে বিধানচন্দ্র রায়ের মতো কিংবদন্তি নেতার হাতে এই বিধানসভার মর্যাদা পৌঁছেছিল শিখরে। ১৯৬৯ সালে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে বিধান পরিষদ বিলুপ্ত করা হয়, যার ফলে পশ্চিমবঙ্গ ‘এককক্ষীয়’ রাজ্যে পরিণত হয়।

জ্যোতি বসুর রেকর্ড থেকে মমতার প্রতিবাদ

১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হয় বামেদের রাজত্ব। জ্যোতি বসুর ২৩ বছরের রেকর্ড মুখ্যমন্ত্রীত্ব আর ভূমি সংস্কারের মতো বৈপ্লবিক আইন এই ভবনেই পাশ হয়েছিল। তবে ২০০৬ সালের ৩০ নভেম্বর এই ভবন সাক্ষী ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনার। সিঙ্গুর ইস্যুতে পুলিশি বাধার প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিধানসভার লবিতে তুমুল ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূল বিধায়কদের বিরুদ্ধে।

২০১১-এর পরিবর্তন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম দুর্গের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভার আবহাওয়াই বদলে যায় ‘পরিবর্তন’-এর স্লোগানে। তবে ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। বিধানসভায় এখন আর বাম-কংগ্রেসের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। লড়াই এখন সেয়ানে সেয়ানে— তৃণমূল বনাম বিজেপি।

আগামী ৪ মে জানা যাবে এবারের ভাগ্য। কার দখলে যাবে এই ঐতিহাসিক লাল বাড়ির চাবিকাঠি? জয়শ্রীরাম নাকি খেলা হবে— শেষ হাসি কে হাসবেন, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy